in

অপরূপা জাফলং ভ্রমণের আদ্যোপান্ত

ইতিহাস আর নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চার এক আদি নিদর্শন সিলেট অঞ্চল। সুলতানি আমলে এই অঞ্চলের নাম ছিল জালালাবাদ। ৩৬০ আউলিয়ার দেশ হিসেবে পরিচিত সিলেট দেশের পর্যটন খাতকে অনেকাংশে সমৃদ্ধ করেছে। আর এই সিলেট ভ্রমণের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি জাফলং।

জাফলং

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার অন্তর্গত ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্ত ঘেঁষে অবস্থিত জাফলং পর্যটন কেন্দ্র। সিলেট শহর থেকে মাত্র ৬২ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে এর অবস্থান হওয়ায় মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটনস্থল হিসেবে পরিচিত জাফলং এলাকাটি ভারতের খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত। পাহাড়, নদী, ঝর্ণা সব মিলিয়ে এক অত্যাশ্চর্য দৃশ্যের সৃষ্টি করে এই জাফলং।

ভারতের মেঘালয় রাজ্যে অবস্থিত ঝুলন্ত ব্রীজ; সোর্সঃ www.jagonews24.com

জাফলংয়ের অপর পাশে অবস্থিত ভারতের ডাউকি অঞ্চল হয়ে প্রবাহিত ডাউকি নদী এই জাফলং দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বর্ষায় শিলং মালভূমির পাহাড়গুলোতে প্রচুর বৃষ্টিপাত হলে সেখান থেকে পাহাড়ি ঢলের সাথে প্রচুর পরিমাণে শিলাপাথর ভেসে আসে এই ডাউকি নদীর মাধ্যমে।

এ কারণে পিয়াইন নদীর অববাহিকায় অবস্থিত জাফলংয়ে প্রচুর পরিমাণে পাথর পাওয়া যায়। পাথর উত্তোলনের মাধ্যমে এখানে গড়ে উঠেছে দেশের সর্ববৃহৎ পাথর শিল্প। আশেপাশের এলাকার মানুষদের এক বৃহৎ অংশের জীবিকার অন্যতম মাধ্যম এই পাথর উত্তোলন ও প্রক্রিয়া জাতকরণকে ঘিরে গড়ে উঠেছে।

জাফলং-এর স্বচ্ছ পানি; সোর্সঃ www.kholamon.com

যেভাবে যাবেন

জাফলং যাওয়ার জন্য প্রথমে আপনাকে সিলেট শহরে যেতে হবে। শহরের মাজারগেট এলাকা থেকে রিজার্ভ সিএনজি ভাড়া করে যেতে পারেন জাফলং। মানুষ বেশি হলে লেগুনা কিংবা মাইক্রো নিতে পারেন। রিজার্ভ সিএনজি ভাড়া ১,৫০০-১,৮০০ টাকা। রিজার্ভ লেগুনা ভাড়া ২,০০০-২,৫০০ টাকা।

তবে কম খরচে যেতে চাইলে লোকাল বাসে করে যাওয়াই উত্তম। কদমতলী বাসস্ট্যান্ড থেকে খানিক সময় পর পর লোকাল বাস জাফলংয়ের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। ভাড়া ৬৫ টাকা। প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগবে জাফলং পৌঁছুতে।

চির যৌবনা জাফলং; সোর্সঃ wonderfulthisbangla.blogspot.com

বাস থেকে নেমে নৌকা রিজার্ভ করতে হবে জিরোপয়েন্ট পর্যন্ত। ভাড়া ৪৫০ টাকা। পর্যটকদের ভিড় বেশি থাকলে নৌকার ভাড়াও বেড়ে যায়। তাই দামাদামি করে নৌকা ঠিক করতে হবে। এক্ষেত্রে নৌকার মাঝি গাইড হিসেবে কাজ করে। মাঝির কাছে প্রয়োজনীয় ইলেক্ট্রনিক গেজেট রেখে স্বাচ্ছন্দ্যে পানিতে গোসল সেরে নিতে পারবেন। নদীর বেশিরভাগ জায়গা কোমর অবধি পানি থাকায় সাঁতার না জানলেও নিরাপদে গোসল করতে পারবেন।

বর্ষা এবং শীত, বছরের এই দুই সময়ে জাফলং সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন রূপে সাজে। বর্ষায় পানির পরিমাণ থাকে বেশি, তাই আশেপাশের সবুজ প্রকৃতি আরও সজীব হয়ে ওঠে। অপরদিকে শীতকালে পানির পরিমাণ কম থাকলেও ঘন কুয়াশার চাদর ফুঁড়ে সুন্দর সবুজ প্রকৃতি আর পাহাড়ে চূড়ায় জমে থাকা মেঘেদের আনোগোণা পর্যটকদের বেশ আকৃষ্ট করে।

ছোট বড় হাজারো পাথড়ের সমারোহ চারদিকে; সোর্সঃ travelersofbangladeshblog.wordpress.com

জাফলংয়ের মূল আকর্ষণ ডাউকি নদীর স্বচ্ছ পানি। নদীর তলদেশের পাথর পর্যন্ত খালি চোখেই স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়াও ভারতের খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝর্ণার রূপ-লাবণ্য মুগ্ধতা ছড়ায় এখানে। ঝর্ণার ঠিক উপরে রয়েছে ঝুলন্ত সেতু। তবে সেটির অবস্থান ভারতের ভূখণ্ডে হওয়ায় সেখানে যাওয়া যায় না।

জাফলং ভ্রমণের আরেকটি বিশেষ দিক হলো এখানে আপনি আদিবাসীদের জীবনচিত্র ও লোকসংস্কৃতি খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। আদমশুমারী অনুযায়ী এখানে প্রায় ২,০০০ জন খাসিয়া আদিবাসী বসবাস করে। মাতৃকেন্দ্রিক সমাজ ব্যবস্থার অন্তর্গত এই আদিবাসী সম্প্রদায়ের জীবন প্রবাহ আমাদের থেকে অনেকটাই আলাদা ও বৈচিত্র্যময়। প্রতিবছর পহেলা বৈশাখকে ঘিরে এখানে বৈশাখী মেলা বসে। এই মেলাকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকা আনন্দে মুখরিত হয়ে ওঠে।

জাফলং থেকে দেখা যাওয়া ভারতের পাথুরে পাহাড়; সোর্সঃ busy.org

সংগ্রামপুঞ্জি ঝর্ণা

জিরোপয়েন্টের খুব কাছেই খাসিয়াপুঞ্জিতে রয়েছে আরেকটি ঝর্ণা। নাম সংগ্রামপুঞ্জি ঝর্ণা বা সেনগ্রামপুঞ্জি ঝর্ণা। জিরোপয়েন্ট থেকে ৮-১০ মিনিট হেঁটে এই ঝর্ণায় যাওয়া যায়। অনেকে এই ঝর্ণাকে মায়াবী ঝর্ণা নামেও চেনে। নৌকার মাঝিই আপনাকে পথ চিনিয়ে নিয়ে যাবে।

ঝর্ণাটি ভারতের খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড় হতে সৃষ্টি হলেও আপনি চাইলে একদম চূড়োর দিকেও চলে যেতে পারবেন। তবে বড় বড় পাথুরে ভঙ্গুর ঝর্ণার উপরে ওঠা বেশ কষ্টসাধ্য এবং ঝুঁকিপূর্ণ। ঝর্ণার হিমশীতল পানি শরীর স্পর্শ করা মাত্রই গাঁয়ে কাটা দিয়ে উঠবে। নিমেষেই মস্তিষ্ক সব গ্লানি ভুলে মনপ্রাণ তরতাজা করে দেবে।

জিরোপয়েন্ট ও ঝর্ণা ছাড়াও এখানে রয়েছে পাঁচটি খাসিয়াপুঞ্জি (খাসিয়াদের গ্রামকে পুঞ্জি বলে), চা-বাগান, পান বাগান ও জমিদার বাড়ি।

সংগ্রামপুঞ্জি ঝর্ণা; সোর্সঃ vromonguide.com

লালাখাল

জাফলং থেকে ফেরার পথে পড়বে সিলেটের আরেকটি প্রসিদ্ধ ট্যুরিস্ট স্পট লালাখাল। বাস কন্টাক্টরকে বলে সারিঘাট লালাখাল রোডের মুখে নেমে যেতে হবে। সেখান থেকে অটোতে করে লালাখাল ট্যুরিস্ট স্পটে। এখানে নৌকা দিয়ে ঘোরা যায়। নদীর স্বচ্ছ সবুজাভ পানি এর মূল আকর্ষণ। ৬০০ টাকা দিয়ে আমরা এক ঘণ্টা নৌকায় ঘুরেছিলাম।

অপরূপ লালাখাল; সোর্সঃ vromonpriyo.com

কোথায় থাকবেন

সিলেটের মাজারগেট সংলগ্ন রোডের দুইপাশে অসংখ্য ভালো ও মাঝারি মানের হোটেল রয়েছে। সেখানে অনায়াসেই থাকতে পারেন। এছাড়াও আছে হোটেল স্টার প্যাসিফিকের মতো লাক্সারী হোটেল।

কোথায় খাবেন

জাফলং ট্যুরিস্ট স্পটের সামনে তেমন ভালো কোনো খাবার হোটেল দেখতে পাইনি। তবে শহরের জিন্দাবাজার এলাকায় অবস্থিত পাঁচভাই ও পানসী রেস্টুরেন্ট দুটি এখানে খুব বিখ্যাত। সিলেটে এসে এই দুই রেস্টুরেন্টে না খেলে ট্যুর যেন অসম্পূর্ণ হয়ে থাকে।

সিলেটের বিখ্যাত পানসী রেস্টুরেন্ট; সোর্সঃ www.banglanews24.com

সতর্কতা

★ জাফলংয়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে পাথর উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশে কিছু কিছু জায়গা খুব গভীর খাদের সৃষ্টি হয়েছে। সেসব জায়গায় সাঁতার কাটা থেকে বিরত থাকুন।
★ খাসিয়া আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা জাফলং। তাই তারা বিরক্ত বোধ করে এমন যেকোনো কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকুন।
★ সুন্দর এই প্রকৃতির ক্ষতি হয় এমন কোনো কাজ করবেন না। কোনো প্রকার ময়লা আবর্জনা নদীতে ও ঝর্ণায় না ফেলার জন্য অনুরোধ রইলো। আর হ্যাঁ, প্রকৃতিকে ভালোবাসুন, ভালোবাসুন তার উদারতাকে। হ্যাপী ট্রাভেলিং।

Feature Image: vromonpriyo.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *