in

একদিনের ভ্রমণে টাঙ্গাইলের বেশ কিছু স্থান

টাঙ্গাইলের উদ্দেশ্যে আমরা রওনা হই সকাল ৮টায়। এবারের ভ্রমণে টাঙ্গাইলের বেশ কিছু স্থানের নামে প্রথমেই ছিল মহেরা জমিদার বাড়ি। তাই আমাদের প্রথম গন্তব্যই ছিল সেটি। ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে প্রায় আড়াই ঘণ্টাতেই আমরা পৌঁছে গেলাম মহেরা জমিদার বাড়িতে।

টাঙ্গাইলের মহেড়া জমিদার বাড়িটি প্রায় ৮ একর জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে আছে। এই জমিদার বাড়িটি জমিদারদের রুচিশীলতা ও আমাদের ঐতিহ্যের এক অমূল্য নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। উঁহু, ভুল বললাম হয়তো। প্রাচীন এই জমিদার বাড়িটিকে আজো টিকিয়ে রাখা হয়েছে। বাড়িটি দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, বাংলাদেশের বাকি জমিদার বাড়িগুলোও যদি এত যত্নে সংরক্ষিত থাকতো!

মহেরা জমিদার বাড়ি; সোর্স: tourguide

এই জমিদার বাড়িটির প্রধান ফটক ২টি। রয়েছে আরো ৩টি বিশাল ভবন। পাশাপাশি রয়েছে কাচারি ঘর, নায়েব সাহেবের ঘর, গোমস্তাদের ঘর, দীঘি আর ৩টি বিশাল লজ। লজ ৩টি যেমন বিশাল আকৃতির, তেমনিই সুন্দর কারুকাজে দৃষ্টিনন্দিত।

এই জমিদার বাড়িটিতে রয়েছে ‘বিশাখা সাগর’ নামক বিশাল এক দীঘি। ভবনগুলোর পেছনে রয়েছে পাসরা পুকুর এবং রানী পুকুর নামক ২টি পুকুর। বাড়িটির একটু ভেতরে গেলেই দেখা মিলবে ছোট একটি পার্কের। শিশুদের এ জায়গাটি বেশ ভালো লাগবে। এখানে ট্রেন ও বোট রাইডের সুযোগ রয়েছে। প্রতি রাইডের টিকেট মূল্য জনপ্রতি ২০ টাকা।

মহেরা জমিদার বাড়ির অংশ; সোর্স: facebook.com 

তাছাড়া রয়েছে চিড়িয়াখানা ও পিকনিক স্পট। চিড়িয়াখানায় খুব বেশি পশুপাখি নেই অবশ্য। পিকনিক স্পটে একটি কৃত্রিম ঝর্ণা রয়েছে। ঝর্ণাটি কৃত্রিম হলেও দূর থেকে এর শব্দ শুনতে বেশ ভালো লাগছিল।

বর্তমানে এই পুরো বাড়িটিতেই পুলিশ ট্রেনিং একাডেমির কার্যক্রম চলে। বেশ কিছু ভবনেই ঢোকার অনুমতি পাওয়া যায় না। প্রায় সব ভবনই বাইরে থেকে ঘুরে দেখতে হয়। এই বিষয়টি বেশ আশাহত করেছে। তবে চাইলে ভবনের কক্ষ ভাড়া নিয়ে রাত্রিযাপন করতে পারবেন। সেক্ষেত্রে কক্ষের আকৃতি অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণ করা হয়ে থাকে।

প্রাচীনত্বে মোড়ানো টাঙ্গাইল; সোর্স: লেখিকা

যাই হোক, এখানকার যতটুকু অংশ দেখা সম্ভব ঘুরে দেখে আমরা রওনা হলাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্য মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। দুপুর হয়ে যাওয়ায় টাঙ্গাইল সদরের নামকরা সুগন্ধা রেস্টুরেন্টে আমাদের দুপুরের খাবার পর্ব সেরে নিলাম। রেস্টুরেন্টটি যাত্রাপথেই পড়ল, তাই আলাদা ঝামেলা পোহাতে হলো না।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে, ভেতরে যেতে প্রথমেই চোখে পড়লো ছোট্ট প্রাচীন একটি মঠ আকৃতির বাড়ি। বাড়িটি ব্যক্তি মালিকানাধীন। অনুমতি নিয়ে সেদিকে এগিয়ে গেলাম সবাই। ছোট্ট, জরাজীর্ণ এই বাড়িটির প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার মূল কারণ এর গায়ে খচিত প্রাচীন কিছু কারুকার্য। মিনিট দশেক এখানকার বাড়ি ও ছোট্ট মন্দির দর্শন শেষে আমরা বেড়িয়ে পড়লাম।

প্রাচীন কারুকার্য; সোর্স: লেখিকা

এরপর পা বাড়ালাম আরেকটু ভেতরের দিকে। এখানে রয়েছে একটি মসজিদ, মাজার, পুরনো কিছু দালান ও একটি জাদুঘর। জাদুঘরটি বন্ধ ছিল তখন। তাই আর জাদুঘর ঘুরে দেখা হলো না। তবে জাদুঘর ঘুরে দেখা না হলেও, তার সাথেই লাগোয়া পুরনো একটি বাড়ির উঠানে বসে বাগানবিলাসের ঝোঁপ দেখতে দেখতে বিকেলের কিছু অংশ বেশ চমৎকারভাবে কাটলো আমাদের।

যেহেতু তখনও আমাদের ভ্রমণের তালিকার নাম শেষ হয়নি তাই এখানে কিছু সময় কাটিয়েই আমরা রওনা হলাম টাঙ্গাইলের ডিসি লেকের উদ্দেশ্যে। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিসি লেক পৌঁছাতে আমাদের সময় লাগলো ২০ মিনিট। ঘড়িতে তখন বিকেল সাড়ে ৪টা।

ডিসি লেকের একাংশ; সোর্স: busy.or

টিকেট কেটে ডিসি লেকের দিকে ঢুকতেই চোখে পড়ল উপচে পড়া ভিড়। সাধারণত ভিড় আমার পছন্দ নয়, তাই জায়গাটিতে এসে খুব একটা খুশি হতে পারলাম না। ভেতরের ছোট একটি ব্রীজে বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে আমরা আবার ফেরার পথ ধরলাম। সন্ধ্যার বিষণ্ণ বাতাস গায়ে মাখিয়ে, সারাদিন ভ্রমণের সুন্দর স্মৃতি জড়িয়ে গাড়ি ছুটে চললো। আমরা পথে ঘুরে গেলাম টাঙ্গাইলের বিখ্যাত সেই কালিদাস মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকেও।

মোট ১১ জনের একটি টিম নিয়ে আমরা গিয়েছিলাম মাইক্রোবাস রিজার্ভ করে। ঢাকা থেকে যাওয়া-আসা, সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার, জমিদার বাড়ি ও ডিসি লেকে প্রবেশের টিকেট মূল্য, পথে টুকটাক খাওয়া-দাওয়া, সব মিলিয়ে জনপ্রতি আমাদের খরচ হয়েছিল ১,২০০ টাকা।

যাওয়ার উপায়:

ঢাকা থেকে গাড়ি রিজার্ভ করে নিয়ে যেতে পারেন। সেক্ষেত্রে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সহজেই পৌঁছাতে পারবেন। তাছাড়া বাসেও যেতে পারেন। ঢাকার মহাখালী থেকে ‘বিনিময়’, ‘নিরালা’, ‘ধলেশ্বরী’, ইত্যাদি বাসগুলো টাঙ্গাইল যায়। ভাড়া ১২০ থেকে ১৫০ টাকা।

বাসে গেলে টাঙ্গাইলের নাটিয়াপাড়া বাস স্ট্যান্ড নামতে হবে। নাটিয়াপাড়া বাস স্ট্যান্ড নেমে অটো বা সিএনজিতে চলে যেতে পারবেন মহেরা জমিদার বাড়ি। ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা। মহেরা জমিদার বাড়িতে প্রবেশের টিকেট মূল্য জনপ্রতি ৮০ টাকা।

মহেরা জমিদার বাড়ি থেকে বের হয়ে একটু বাইরের দিকে আগালেই অনেক অটো দেখতে পাবেন। সেখান থেকেই অটো ঠিক করে চলে যাবেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ভাড়া ৫০ থেকে ৬০ টাকা (জনপ্রতি)। ঠিক একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে অটোতে যেতে পারবেন ডিসি লেক। ভাড়া ২০ থেকে ৩০ টাকা। ডিসি লেকের ভেতরে ঢুকতে জনপ্রতি টিকেট মূল্য ৬০ টাকা।

মহেরা জমিদার বাড়ি থেকে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বা ডিসি লেকে যাওয়ার পথেই পড়বে সুগন্ধা রেস্টুরেন্ট (পুরাতন বাস স্ট্যান্ডে এই রেস্টুরেন্টটি)। এটি টাঙ্গাইলের বেশ নামকরা রেস্টুরেন্ট। এখানকার হাড়ি খিচুড়িতে দুপুরের খাবার পর্ব চুকিয়ে নিতে ভুলবেন না। আর ডেজার্টে তো পেয়েই যাবেন টাঙ্গাইলের বিখ্যাত চমচম!

ফিচার ইমেজ- লেখিকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *