in

কলকাতায় মল্লিক ঘাটে এক শুভ্র সকাল

অতিরিক্ত ভিড়ের ভয়ে খুব সকালে উঠেই চেপে গেলাম বিবাদিবাগের ট্রেনে৷ সকাল সাড়ে ছটায় অনান্য ট্রেনের চাপ বেশ কম থাকে বলেই এই লোকালে ওঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছি গতকাল রাতেই। তবে ভোরের মল্লিক ঘাটের ফুলের বাজার আর হাওড়া ব্রিজের নিচে পুজো আর্চনার দেখার জন্যে একটু ভিড়-ভাট্টা হলেও বা মন্দ কী! 

ঈথা দিদিকে মহিলা কামরায় উঠিয়ে বেশ ভয় হচ্ছিলো বলা চলে। দিদি এমনিতেও প্রথমবারের মতো কোলকাতায় এসেছে। তার সাথে লোকাল ট্রেনের প্রচণ্ড ভিড় সহ্য করতে পারবে কিনা তা নিয়ে আমার বেশ সংশয় ছিল কারণ আমি নিজেও সহ্য করতে পারি না মাঝে মাঝে। তাই আলাদা হয়ে মহিলা কামরাতেই উঠানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। আলাদা হতে ভয় হচ্ছিল, তবুও দিদির আত্মবিশ্বাস দেখে ভরসা পেয়ে গেলাম।

ভোরের যাত্রা। ছবিঃ লেখক 

যাই হোক, দমদম স্টেশনের আগে একটু ক্রসিংয়ে পড়লেও বেশ কম সময়েই বিবাদিবাগ স্টেশনে পৌঁছে গেলাম আমরা। বের হয়ে দেখি দিদি আমার আগেই বের হয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্টেশনে। আমার দিকে তাকিয়ে ভাবসূচক হেসে বললো আরে এ কোনো ব্যাপারই না। আমি ভাবছিলাম যদি পুরুষ কামরায় উঠত তাহলে এই সময়ে ঠিক কী বলত দিদি। 

যাই হোক ভালোভাবে আসতে পেরেছি এটাই ভালো লাগছে। ভোর সাড়ে সাতটা। কলকাতা তখনো জেগে ওঠেনি ভালোভাবে, তবে গঙ্গা আর মল্লিক ঘাট ফুলের বাজারে যে স্নান আর কেনাকাটার ধুম পড়ে গিয়েছে তা বুঝতে পারছিলাম দূর থেকেই। মিলেনিয়াম পার্কের মধ্যে দিয়ে সোজা হেঁটে চললাম হাওড়ার দিকে। সবে মাত্র রাতের ট্রামগুলো ঘুম ভেঙে গা ঝাড়া দিয়ে চলতে শুরু করেছে। 

স্যাঁতসেঁতে কলকাতার দেখা মিললো মল্লিক ঘাটে এসে। ছবিঃ লেখক   

মল্লিক ঘাট ফুলের বাজারে ঢুকতেই পরিবেশ পাল্টে যেতে দেখলাম। কলকাতা সব সময়ই আমার কাছে একটু ভেজা ভেজা আর স্যাঁতসেতে মনে হয়। এখানে এসে এই ধারণা গাঢ় রূপ নিলো। তরি-তরকারি, ফুল আর আবর্জনার সাথে বৃষ্টির পানি মিশে বিশ্রি একটা গুমোট গন্ধ চারদিকে ভাসছে। সেই সাথে ফুলের গন্ধ যেন ছাপিয়ে উঠছে এই ভ্যাপসা কলকাতায়। 

ওভার ব্রিজ পার হয়ে নিচের দিকে তাকাতেই আসল সুন্দর ফুটে উঠল। নোংরা কালো রাস্তার উপর হাজার হাজার রঙ এর ফুলগুলো যে এত অদ্ভুত সুন্দর একটা দৃশ্য বানিয়ে রাখতে পারে এখানে না আসলে বুঝতাম না। এই ভোরে যেন পুরো শহর কলকাতা মেতে উঠেছে ফুলের উৎসবে। আর ঘাট থেকে ভেসে আসছে উলু আর শংখের সুর। 

ফুলের হাটে চলছে বেচাকেনার  ধুম। ছবিঃ লেখক 

যত সামনের দিকে যাচ্ছি তত ফুলের মেলা বাড়ছে। রক্ত জবা, গাদা, গোলাপ, সূর্যমুখী, পলাশ, রাধাচূড়ার ডাল, বেলী, রংগন সহ হাজার হাজার জাতের ফুল। কলকাতা সহ আশেপাশের এলাকার লোকেরা বিয়ে, উৎসব, পুজোর জন্য প্রতিদিন ভোরে উঠে চলে আসেন কলকাতার এই বিখ্যাত ফুলের বাজারে। 

ফুলের বাজার ছেড়ে যখন ঘাটে চলে এলাম, দৃশ্যপট যেন চোখের সামনেই বদলে গেল। ঘাটের পানিতে স্নানে নেমেছেন শহরের সব পুজারীরা। স্নানের আগে মা রূপী নদীকে কেউ প্রণাম করে যাচ্ছেন, অনেকে স্নান থেকে উঠে এসে করছেন। এই ভক্তি, বিশ্বাসের সাথে হাওড়া ব্রিজ আর কলকাতার ভোরের কুয়াশা যেন মিলেমিশে গভীর একটা ধ্যান যুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে চলেছে। 

আর্চনা চলছে মা গঙ্গার কাছে। ছবিঃ লেখক 

নদীর এপাশে হাওড়া ব্রিজের এমাথা থেকে ওমাথার দিকে তাকালেই পড়ে ২০০ বছরের বেশী পুরনো হাওড়া রেলওয়ে স্টেশন। এত বড় স্টেশন খুব কম চোখে পড়ে। খুব সম্ভবত ভারতের সবচেয়ে বড় রেলওয়ে স্টেশন এটি। নদীর মধ্যে দিয়ে তখন ফেরি চলাচল শুরু হয়ে গিয়েছে।

ঘাট থেকে একটু ভেতরে ঢুকতেই আবার অবাক হয়ে গেলাম। ফুলের বাজার ভেতরেও আছে একদম খেয়াল করিনি। ভেতরের বাজারটি আরো বেশী বড় আর বেশী জমজমাট মনে হলো আমার কাছে। এখানের সারি দেয়া দোকানগুলো দেখে মনে হলো যেন ফুলের বিশাল এক সুপার মার্কেট। 

প্যাকেট  জাত করে রাখা ফুল  গুলোর ক্রেতার অভাব নেই। ছবিঃ লেখক 

ফুলের বাজারের মধ্যে অন্ধকার আর আলোর খেলা চলছে রঙ বেরঙের ফুলের সাথে। এই ব্যস্ততার ভিড়েও চলছে হরদম খাবার আর চায়ের দোকানগুলো। ফুলের ছবি তুলতে তুলতে একটা সময় দিদিকে সামনে থেকে হারিয়ে ফেললাম। দিদির কাছে কোনো ভারতীয় নাম্বার ছিল না তাই বেশ ভয় হতে লাগল। প্রায় ২০ মিনিট খোঁজার পর দেখলাম একটা ঘুপচির মধ্যে বসে ছবি তুলছেন উনি। আমার শুকনো মুখ দেখে হেসে দিয়ে বললো হারাইনি রে। তোর দিকে আমার খেয়াল ছিল। 

কবির রক্তখেকো ট্রামে  যাত্র। ছবিঃ লেখক 

সোজা চলে এলাম হাওড়া ব্রিজে। দিদিকে কাছ থেকে এই ৪-৫ শ বছরের পুরনো ব্রিজ দেখানোর ইচ্ছে ছিল। কিছুক্ষণ দেখে দিদি বললেন চলো ট্রামে চাপা যাক। কফি হাউসে বসে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে আসি। যে কথা সেই কাজ। বৃষ্টি শুরু হলো। আমদের ট্রামটি ঘটাং ঘটাং শব্দে চলতে থাকল শহর কলকাতার বুক চিরে। 

কীভাবে যাবেন:

ঢাকা থেকে বেনাপোল বাসে এসে ইমিগ্রেশন শেষ করতে হবে। এর জন্য ভারতীয় যে কোনো পোর্টের ভিসা থাকলেই হবে। ইমিগ্রেশন সেরে ওপারে পেট্রাপোল থেকে সরাসরি কলকাতার বাস পাওয়া যায়। অথবা অটোতে করে বনগাঁ স্টেশনে গিয়ে কলকাতার ট্রেন ধরতে হবে। ফেরার পথেও একই রাস্তা। এছাড়া বিকল্প রাস্তা হিসেবে রয়েছে মৈত্রী এক্সপ্রেস, যা ঢাকা থেকে ছেড়ে যায় কলকাতার উদ্দেশ্যে শিয়ালদহ বা দমদম থেকে সরাসরি ট্রেন আছে বিবাদিবাগ স্টেশন পর্যন্ত। ভাড়া পড়বে ১০ রুপি। সেখান থেকে টোটোতে ভাড়া নেবে ১০ রুপি রিকশায় ২০ রুপি অথবা হেঁটে গেলে ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে পৌঁছানো যাবে। দুপুরে খাবারের খরচ  পড়বে জন  প্রতি ১০০ – ৩০০ রুপি। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *