in

দার্জেলিংয়ের যেখানেই যাই; কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা পাই

রাতের দার্জেলিং সত্যিই অপরূপ সুন্দর। দেখছিলাম আগের রাতে। এজন্য দার্জেলিংকে বলা হয় পাহাড়ের রানী। পাহাড়ে ঘেরা অপূর্ব এই স্থানটি হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত। কাঞ্চনজঙ্ঘার অনুপম সৌন্দর্য এবং টাইগার হিলের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য ছাড়াও বিভিন্ন কৃত্রিম এবং প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখার জন্য প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ ভিড় করে এই দার্জেলিংয়ে।

জাপানিজ ট্যাম্পল থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা; ছবি- সাইমুন ইসলাম 

চা বাগান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার পর থেকে দার্জেলিং দেখার তৃষ্ণা বেড়েছে আরও বেশি। উঁচু পাহাড়ের ঢালে অগণিত চা গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার সাধ যেন মিটছে না আর। তাই এবার বেরিয়ে পড়ি পরবর্তী গন্তব্যের দিকে। জীপ এগিয়ে যাচ্ছে পিস প্যাগোডা ও জাপানিজ ট্যাম্পলের দিকে।

জীপ যেদিকে যাচ্ছে কাঞ্চনজঙ্ঘাও আমাদের সাথে এগিয়ে যাচ্ছে। সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, এ যেন এক অন্য রকম পাওয়া আমাদের জন্য। পিস প্যাগোডা এবং জাপানিজ ট্যাম্পল শহরের খুব কাছেই। শহর থেকে যেতে সময় লাগে ১৫ মিনিটের মতো। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ ধরে জীপ এগিয়ে যাচ্ছে কৃত্রিম এই দৃশ্য দেখার জন্য। উঁচু নিচু পাহাড়ি রাস্তা ধরে অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে পৌঁছে গেলাম শান্তির এই উপাসনালয়ে।

প্রথমে ঢুকতেই দেখা মিলবে জাপানিজ বৌদ্ধ মন্দির। এই ট্যাম্পলে প্রবেশের পথটা এক কথায় দারুণ সুন্দর। চারপাশে শান্তি শান্তি একটা ভাব বজায় আছে। পবিত্রতার ছোঁয়া লেগে আছে চারিধারে। রঙ বেরঙের ফুলের চাদর দিয়ে সাজানো আছে এর চারপাশ। তারই পাশে মাথা উঁচু করে আছে পাইন গাছের সারি। সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতেই দু’পাশে হরেক রঙের ফুলেরা আপনাকে সম্ভাষণ জানাবে সাদরে।

সিংহ দ্বার; ছবি- সাইমুন ইসলাম 

ছোট দোতালা ভবন এটি। সামনে এক টুকরো ফুলের বাগান আছে। আর তার আশেপাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পাইন গাছ। প্রথম সিঁড়ি বেয়ে উঠতেই দরজায় সোনালি রঙের দুটি সিংহের মূর্তি তার স্বমহিমায় সার্বক্ষণিকভাবে পাহারায় আছে। ভেতরে বড় জাপানি সাধুর মূর্তিও আছে। মূলত এই বৌদ্ধ মন্দিরটি জাপানি সাধুর অর্থায়নে তৈরি বলে একে জাপানিজ টেম্পল বলা হয়।

পিস প্যাগোডা; ছবি- সাইমুন ইসলাম 

এখানে ঢুকেই আমি মুগ্ধ এর সৌন্দর্যে। বাকিরা তখন ক্যামেরায় ক্লিক ক্লিকে ব্যস্ত। আর ডান দিকে ঘুরতেই চোখে পড়বে পিস প্যাগোডা। পুরোটা সফেদ সাদা রঙে মোড়া। সামনের চত্বর, সিঁড়ি শ্বেত পাথরের। পুরো প্যাগোডাটি শান্ত এবং নীরব আবরণে ঘেরা। পিস প্যাগোডার অর্ধেকটা উপরে ওঠার সিঁড়ি আছে যেখান থেকে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির লীলাখেলা অপার বিস্ময়ে দেখা যায়। দূরে হাতছানি দিয়ে ডাকে কাঞ্চনজঙ্ঘা। এখান থেকেও স্বচ্ছভাবে দেখা যায় কাঞ্চনজঙ্ঘা।

পাইন গাছ; ছবি- সাইমুন ইসলাম 

অনেক বড় বড় লেখকের লেখায় পাইন গাছের বর্ণনা পড়েছি। পৃথিবীর সুন্দর গাছগুলোর মধ্যে পাইন গাছ অন্যতম। সাধরণত শীতপ্রধান দেশে পাইন গাছ বেশি দেখা যায়। আর দার্জেলিংয়ে এই প্রথমবার নিজের চোখে পাইন গাছ দেখে তার প্রেমে পড়ে গেলাম।
পাইন গাছের প্রেম বুকে নিয়ে এবার এগিয়ে যাই আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ঘুম মনেস্ট্রির দিকে। টাইগার হিল যাওয়ার পথে পড়বে এই মনেস্ট্রি। একেবারে মেইন রাস্তার পাশেই। যেহেতু আমরা প্রথমদিন টাইগার হিল যেতে পারিনি, তাই দার্জেলিংয়ের চারপাশটা দেখে বেড়াচ্ছি।

ঘুম মনেস্ট্রি; ছবি- বিপু বিধান 

মেইন রাস্তার পাশেই বৌদ্ধ সভ্যতার বিখ্যাত এই ঘুম মনেস্ট্রি। ভেতরে ঢুকতেই চারপাশের শান্ত হাওয়া ছুঁয়ে যায় শরীরকে। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতেই দেখা মেলে ঘুম মনেস্ট্রির সম্পূর্ণ অবয়ব। ঘুম মনেস্ট্রির নান্দনিক কারুকার্য সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করবেই। বৌদ্ধ ধর্মালম্বি এই মনেস্ট্রিকে ঘিরে আছে পাইন বন।

ঘুম মনেস্ট্রি ভিতরে বৌদ্ধের মূর্তি; ছবি- বিপু বিধান 

মন্দিরের ভেতরে আছে বৌদ্ধের সুবিশাল মূর্তি। ধর্মপ্রাণ লোকের আনাগোনায় মুখরিত। জুতা খুলে ভেতরে ঢুকতেই টের পেলাম বৌদ্ধ সভ্যতার এক অনন্য নিদর্শন এই মনেস্ট্রি। আর তাছাড়া শহরের বেশ কাছে হওয়ায় মানুষের পদচারণও বেশি। মনেস্ট্রির ভেতর হালকা নাস্তার ব্যবস্থা আছে। ৪০ রূপি দিয়ে নাস্তা সেরে নিলাম। আরেকটু ঘুরে মনেস্ট্রির কিছু ছবি তুলে বের হই বাতাসিয়া লুপ যাওয়ার জন্য।

হাল্কা খাবারে ব্যবস্থা; ছবি- বিপু বিধান 

বাতাসিয়া লুপ কৃত্রিমভাবে তৈরি অপরূপ সুন্দর একটি জায়গা। ঘুম মনেস্ট্রির কাছেই এই বাতাসিয়া লুপ। এখানেই দার্জেলিংয়ের টয় ট্রেন ৩৬০ ডিগ্রী ঘুরে ঘুম স্টেশনে যায়। মাঝখানে গোর্খা আর্মিদের স্মৃতিস্তম্ভ আছে।

গোর্খা আর্মিদের স্মৃতিস্তম্ভ; ছবি- বিপু বিধান 

আমাদের কপাল ভালো থাকায় এখান থেকেও আমরা পরিষ্কারভাবে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাই।

বাতাসিয়া লুপ থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা; ছবি- বিপু বিধান 

এছাড়া ৩০-৫০ রূপির বিনিময়ে বাইনোকুলারের মাধ্যমে হিমালয় পর্বত সহ নেপাল বর্ডার দেখা যায়। পুরো জায়গাটি ঘিরে আছে সুন্দর সুন্দর ফুলের বাগান। তাছাড়া গোর্খা আর্মিদের এবং নেপালিদের পোশাক ভাড়া পাওয়া যায়। এগুলো পরে ক্যামেরায় স্মৃতি ফ্রেম-বন্দি করতে পারবেন। তবে ঐদিন আমাদের সময়ের স্বল্পতার কারণে ঐ পোশাক পরতে পারিনি। সে জন্য অবশ্য খুব বেশি মন খারাপ ছিল না। কেননা যেখানেই যাচ্ছি কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা পাচ্ছি, শুধু দেখা বললে ভুল হবে। পরিষ্কারভাবে চোখের সামনে দৃশ্যমান। এই ভালো লাগাটুকু যেন সার্বক্ষণিক সঙ্গী হয় আমাদের।

ইচ্ছে ছিল সাত ভাই চম্পা হওয়ার কিন্তু হয়ে গেলাম চার ভাই চম্পা; ছবি- সাইমুন ইসলাম 

এগুলো ঘুরে দেখতে দেখতে ততক্ষণে বেশ বেলা হয়ে গেছে। সাথে করে আনা হালকা স্ন্যাক্স দিয়ে দুপুরের খাবার হিসেবে চালিয়ে দিচ্ছি। কারণ তখন যদি খেতে যাই তাহলে ঐদিন আর রক গার্ডেনে যাওয়া হবে না। তাই অগত্যা মত দিতে হলো রক গার্ডেন দেখে এসে কিছু একটা খেয়ে নেবো।

রক গার্ডেনের উদ্দেশ্যে যাত্রা 

বিপু’দা বলছিল যে রক গার্ডেন যাওয়ার রাস্তা নাকি বেশ রোমাঞ্চকর। পাহাড়ের গা কেটে কেটে নিচের দিকে নামতে হয়। তাই মনে মনে বেশ উত্তেজিতও ছিলাম রক গার্ডেন যাওয়ার জন্য। শীতের দুপুরে রক গার্ডেনের দিকে যাত্রা শুরু করি।

***ফিচার ইমেজ: সাইমুন ইসলাম 

(চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *