in

দার্জেলিংয়ে প্রথম কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শন

ফুলবাড়ি পোর্টে যাওয়ার আগে বিএসএফের কাছে পাসপোর্ট এন্ট্রি করতে দেই। আগে বলে রাখা ভালো, ভারতের মাটিতে পা রাখার পর থেকে দোভাষীর কাজ একান্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করছে আমাদের মাসুদ ভাই। আমি জানতাম সে ভালো হিন্দি জানে কিন্তু এটা জানতাম না যে সে এত ভালো হিন্দিতে।

এন্ট্রির সময় বিএসএফের এক সৈনিকের সাথে কথা বলে খাতির জমিয়ে ফেলল। এমনকি সেই সৈনিকের বাড়ি রাজস্থানে যাওয়ার দাওয়াত দিল মাসুদ ভাইকে। এই কথাবার্তা শেষ করে পোর্টের দিকে যাই। পোর্টের ফরমালিটি শেষ করে ডলার ভাঙিয়ে রুপি করেনি।এরপর শিলিগুড়ির দিকে রওনা হই।  

ভেজ থালি প্রতি প্লেট ৭০ রুপি। 

শিলিগুড়ি যখন পৌঁছাই তখন দুপুর হয়ে গেছে। সবাই তখন প্রচুর ক্ষুধার্ত। একটা ভালো খাবার দোকান দেখে বসে গেলাম সবাই খেতে। ভাত, ডাল, ভাজি, সবজি আর পাঁপড় দিয়ে খাওয়া শুরু করি। সাথে খাসীর মাংস তো আছে-ই।

ভরপেট খেয়ে সবাই তখন সৌরভ ভাইয়ের জন্য অপেক্ষা করছি। সৌরভ ভাই চেংরাবান্ধা পোর্ট দিয়ে ভিসা করছে আর বাকিরা বাংলাবান্ধা দিয়ে। ঐ পোর্টে বেশ ভিড় থাকায় তার শিলিগুড়ি আসতে বেশ খানিকটা সময় বেশি লাগে।

বিদেশের মাটিতে কম দামে কিছু কিনতে পেরে সবাই খুশি। 

ঘণ্টা দুয়েক সময় হাতে থাকায় শিলিগুড়ি শহরটা একটু ঘুরে দেখি। আর টুকটাক কেনাকাটা ছিল সেগুলো এই সময়ের মধ্যে করে ফেলি। শ্রী লেদারের খুব নাম ডাক শুনেছি তাই প্রথমেই যাই সেখানে। আমাদের দেশের তুলনায় সেখানে জুতার দাম অনেক কম। তবে কলকাতার শ্রী লেদারেরতুলনায় শিলিগুড়িরটা অনেক ছোট এবং কালেকশনও কম।

শ্রীলেদার থেকে যাই বিগ বাজারে। এখানে ঢুকেই মুখ হা হয়ে গেল আমার। কী নেই এখানে? মোটামুটি সব প্রোডাক্টের সাথে বাই ওয়ান গেট ওয়ান ফ্রি দিচ্ছে। ঘুরে দেখতে দেখতে এর-ই মধ্যে সৌরভ ভাই শিলিগুড়ি চলে আসে। ততক্ষণে বিকেল হয়ে গেছে। মাসুদ ভাই দার্জেলিং যাওয়ার জীপ ঠিক করে ১,৭০০ রূপিতে। রিজার্ভ জীপে করে দার্জেলিংয়ের দিকে রওয়ানা হই।    

রিজার্ভ জিপে করে দার্জেলিংয়ের পথে। 

শুনেছি শিলিগুড়ি থেকে দার্জেলিংয়ে যাওয়ার রাস্তা নাকি অনেক সুন্দর। যেহেতু রওয়ানা হতে সন্ধ্যে হয়ে গেছে তাই দিনের আলোয় দার্জেলিংয়ের রাস্তা দেখার সুযোগ হয়নি। তবে সেই আক্ষেপ বেশিক্ষণ করতে হলো না। ভরা পূর্ণিমায় পাহাড়ের আঁকাবাঁকা গা ধরে এগিয়ে যেতে থাকি। আর মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে থাকি সবাই।

সর্পিল এই পথ ধরে পূর্ণিমার আলোয় স্নান করতে করতে পাহাড়ের গা বেয়ে উপরে উঠছি। পাহাড় বেয়ে যত উপর দিকে উঠছি তত বেশি তাপমাত্রা কমতে শুরু করল। জীপের জানালা দরজা আটকানো থাকলেও শীতকে কোনোভাবেই আটকানো যাচ্ছে না।

দার্জেলিংয়ে কোথায় কোথায় ঘুরবেন তার একটা তালিকা। 

দার্জেলিং শহরে যখন পৌঁছাই তখন রাত ৮টা বাজে। এই সন্ধ্যা রাতেই চারপাশটা কেমন নীরব হয়ে গেছে। রাস্তাঘাটে মানুষজন তেমন একটা নেই। মাসুদ ভাই আর বিপু’দা গিয়ে হোটেল ঠিক করে আসে। খুব সাধারণ মানের একটা হোটেলে উঠি আমরা। যেহেতু হোটেলে আমরা বেশি সময় থাকবো না, তাই খুব দামী হোটলে উঠে টাকার অপচয় করতে চাইনি।

হোটেলে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে নিতেই বিপুদা তাড়া দিতে থাকে খেতে যাওয়ার জন্য। কেননা এখানে রাত ৮/৯টার মধ্যে মোটামুটি সব দোকানপাটই বন্ধ হয়ে যায়। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বেরিয়ে পড়ি।  

খাবার পেয়ে খুশি সবাই। 

হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম দার্জেলিংয়ের বিগবাজারের কাছেই। এর পাশেই একটা খাবারের দোকান পাওয়া গেল। দোকান তখন বন্ধ করি করি অবস্থা, তাই ঝটপট ৬ থালি খাবারের অর্ডার দিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করি। কবজি ডুবিয়ে খেয়ে বাইরে এসে দাঁড়িয়ে বিপু’দাকে বললাম আজ সাইমুনের জন্মদিন। একটা কেক ম্যানেজ করতে পারলে ভালো হতো। ভাগ্যক্রমে বিগবাজারের পাশেই ক্যাফে কফি ডে নামে একটা দোকান পাওয়া গেল। এটাও তখন বন্ধ করি করি অবস্থা। অনেক রিকোয়েস্ট করে বলাতে তার রাজি হয় কেক বিক্রি করতে।

কেক নিয়ে হেঁটে হেঁটে আমরা মল চত্বরে যাই। রাত তখন ১১টার বেশি বাজে সম্ভবত। মল চত্বর একদম সুনসান। আমরা ছাড়া আর কেউ নেই। হাড় কাঁপানো শীতে সুনসান পরিবেশে কেক কেটে সাইমুনের জন্মদিনের উৎযাপন করা হয়।   

জন্মদিনে কেক কাটতে পেরে বেজায় খুশি বার্থডে বয়।

ঠাণ্ডায় জমে যাওয়ার অবস্থা সকলের। দ্রুত পায়ে হোটেলে ঢুকি। তখনও জানতাম যে বিপু’দার ভেল্কি দেখা বাকি এখনও। রাত ১টায় বিপুদা গো ধরল সে এখন গোসল করবে। যেই কথা সেই কাজ। ঐ ঠাণ্ডা পানি হাতমুখেই আমরা দিতে পারছিলাম না আর সেই ঐ পানি দিয়ে গোসল করে আসলো।

রক্ত শূন্য মুখ করে বাইরে বেরিয়ে এসেই কাপাকাপি শুরু করে দিল। সাইমুন দৌড়ে কম্বল নিয়ে এসে বিপু’দাকে দশ মিনিট জড়িয়ে ধরে বসে থাকলো। এরপর কোনোমতে তার কাপাকাপি থামল। 

ইসলামি হোটেলের সামনে সুন্দর এই ফুলের গাছের সাথে ছবি তোলার লোভ সামলাতে পারি নি। 

সকালে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেস হয়ে কাছেই এক ইসলামিয়া হোটলে সকালের নাস্তা সেরে নেই। দার্জেলিংয়ের চারপাশটা দেখার জন্য জীপ ঠিক করি। প্রথমেই যাই টি-গার্ডেনে। টি-গার্ডেনে যাওয়ার পথে অপ্রত্যাশিভাবে দেখা পাই কাঞ্চনজঙ্ঘার। আহ! এই সেই কাঞ্চনজঙ্ঘা। অপার বিস্ময় আর মুগ্ধ নয়নে চেয়ে রই কিছুক্ষণ। চা বাগানের পথ ধরে কিছুটা নিচে নেমে আসি।

রোদ্র উজ্জল দিনে জ্বলজ্বল করে দৃশ্যমান কাঞ্চনজঙ্ঘা। নিজের মর্জি মতো ক্ষণে ক্ষণে তার রূপ বদলায়। বার বার মনে হতে থাকে অল্প কিছু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। চাইলেই ছুঁয়ে ফেলা যায়।

এক মুহুর্তের জন্য হলেও মনে হবে হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেখি।

কোথায় যেন শুনেছিলাম যে রবী ঠাকুর বেশ কয়েকবার গিয়েও কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা পাননি। আর আমরা প্রথমবার গিয়ে তার দেখা পেয়ে গেলাম। তাই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার জন্য সাধ সাধনা করতে হলো না। ঘুরতে ফিরতে যখন তখন চোখে পড়ে। এজন্য লোকে বলে, শীতের জায়গায় শীত কালে ভ্রমণই উত্তম।  

                                                                                                                          (চলবে)   

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *