in

নাইক্ষ্যংছড়ি উপবন লেক এবং বিস্তারিত

সময়টা এখন সমুদ্রে যাওয়ার। শীত এখনো সেভাবে শুরু হয়নি, আছে আবার হালকা বৃষ্টিও। এই সময়টাতে ভ্রমণবিলাসিরা ছোটেন সমুদ্রের দিকে। সমুদ্রের সাথে পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে হিমছড়ি তো আছেই, সাথে দেখে আসা যায় বান্দরবানের অপরূপ প্রকৃতিও। এখন প্রশ্ন আসে, কীভাবে? সেই উত্তরটা জানা নেই অনেকেরই। সেই উত্তর এবং তার বিস্তারিতই লিখবো আজ।

কক্সবাজার থেকে মাত্র ২৮ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা। এটি বান্দরবানের সবুজে ঘেরা ছোট্ট একটি উপজেলা। নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় রয়েছে প্রাণ ভোলানো সৌন্দর্যের উৎস, নাইক্ষ্যংছড়ি উপবন লেক। সমুদ্রে ঘুরতে গিয়ে ঘুরে এসেছিলাম বান্দরবানের এই উপবন লেকটিও। যেখানে আবার এক বৃষ্টির দিনে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে আমার বারবার।

নাইক্ষ্যংছড়ি উপবন লেক; সোর্সঃ Taslima Bably

সেদিন কক্সবাজার থেকে গিয়েছিলাম রামু বৌদ্ধ বিহারে। বৌদ্ধ বিহারটি ঘুরতে একদমই কম সময় লাগে। সেখান থেকে বেরিয়ে আবার হোটেলে যখন ফিরে যাবো, তখন আপু বললো রাস্তায় দেখে এসেছিল বান্দরবনের একটি উপজেলায় যাওয়ার ফলক। অটো রিকশার ড্রাইভারকে সে ব্যাপারে জিজ্ঞেস করায় উনি জানান, সেখানে নাইক্ষ্যংছড়ি উপবন লেক নামে অপরূপ একটি জায়গা রয়েছে।

এটা শোনার পর আর কিছু ভাবাভাবির দরকার পড়ে না। আমরা রওনা দিলাম নাইক্ষ্যংছড়ির দিকে। যাওয়ার পথে রাস্তাটাই চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছিলো। একবারে পাহাড়ি গ্রামের ভেতর দিয়ে সরু একটি রাস্তা। সেখানে প্রকৃতির কোন উপাদানটি নেই, ভাবতে বসা লাগে। রাস্তার দুই পাশে পাহাড়, নদী, বন, গ্রাম, পাহাড়ি বাড়িঘর, বিভিন্ন মন্দির বা বিহারের চূড়া, সারি সারি সবুজ, রাবার বাগান, পাহাড়ি ঢালের পানি, ছোট ছোট পাহাড়ি বাজার, পাহাড়ি রঙ বেরঙের ফুল ইত্যাদি সবই আছে।

উপবন লেকে যাওয়ার রাস্তা; সোর্সঃ Taslima Bably

সবকিছুকে পেছনে ফেলে আমাদের অটোরিকশাটি এগিয়ে চলছিল নাইক্ষ্যংছড়ি উপবন লেকের দিকে। যেতে যেতে আমরা রাস্তার সৌন্দর্য গিলে নিচ্ছিলাম। শেষে ঘণ্টা দেড়েকের রাস্তাটি শেষ হলো। আমরা পৌঁছে গেলাম নাইক্ষ্যংছড়ি উপবন লেকের প্রবেশ পথে। ওখান থেকে আর অটোরিকশা যেতে পারে না। বাকিটা পথ পাহাড় চেরা রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলতে হয়। ট্র্যাকিং না হলেও নিচ থেকে পাহাড়ের উপরে ওঠার এই রাস্তাটি আপনাকে বেশ রোমাঞ্চ জোগাবে।

সবুজের এর মিলনমেলায় এক কাপ চা না হলে ঠিক জমে না; সোর্সঃ Taslima Bably

মিনিট সাতেক হাঁটার পর পাহাড়ের উপর আমরা একটি চায়ের দোকান পেলাম। দোকানটিতে আবার বাঁধানো বসার জায়গা। ওই জায়গাটায় বসে চা খাচ্ছি, ভাবতেই আনন্দ লাগছিল। চা খেতে খেতে চায়ের দোকানি স্থানীয় আদিবাসীর লোকটির সঙ্গে আমরা অনেকক্ষণ গল্প করলাম। উনি জানালেন এই চায়ের পানি আনতে হয় উপবন লেকের প্রবেশমুখে গিয়ে পাহাড় থেকে নেমে। এমনকি উনাদের খাবারের সব পানি আনতে সেখানেই যেতে হয়।

চা আর গল্পের পালা শেষ হলো। আমরা উনার থেকেই বাঁশের লাঠি ভাড়া নিলাম। উনি তার ছোট ছেলেটাকে আমাদের গাইড হিসেবে সাথে দিয়েও দিলেন। এমন আন্তরিকতায় মুগ্ধ না হয়ে থাকা যায় না। এরপর আমাদের সেই গাইড আমাদের নিয়ে হাঁটা দিলো লেকের দিকে। আরো প্রায় সাত-আট মিনিট হাঁটার পর পৌঁছে গেলাম লেকের টিকেট কাউন্টারে। সেখানে থেকে জনপ্রতি ১০ টাকা দামের টিকেট নিয়ে লেকের মধ্যে প্রবেশ করলাম।

মায়ানমার আর বাংলাদেশের পাহাড়; সোর্সঃ Taslima Bably

প্রবেশ পথেই একটি পাহাড়ে ওঠার সিঁড়ি রয়েছে, তার উপরে রয়েছে একটি বসার বেদি। আমাদের ছোট্ট গাইড জানালো ওখান থেকে মায়ানমারের পাহাড় দেখা যায়। তাই উপরে উঠে বেদিতে বসে কিছুক্ষণ দুটো দেশের সবুজ একসাথে উপভোগ করলাম। সেখান থেকে নেমে যাওয়ার পথে একটি ছোট্ট সাঁকোর পর রঙিন বাঁশের ঘর পড়লো। ওখানে গিয়ে সবাই মিলে বেশ কিছু ছবি তুলে ফেললাম। এরপর লক্ষ্য সোজা লেক।

আর পাঁচ মিনিটের মতো হাঁটার পরেই পৌঁছে গেলাম নাইক্ষ্যংছড়ি উপবন লেকে। লেকে ঢুকে চারপাশের সবুজ আর ঝুলন্ত সেতুর সৌন্দর্যে আমরা তখন পুরোপুরি বিমোহিত। চারপাশে পাহাড়ের আলাদা একটা শব্দ। হয়তো ঝিঁঝি ডাকছে বা পাখি, সব মিলিয়ে অদ্ভূত শান্তির একটা পরিবেশ। পাহাড়ের কোণায় গিয়ে দাঁড়ালে দেখা যায় সারি সারি সেগুন গাছসহ আরো নানা গাছ। পাহাড়ি নানান ধরনের ফুল তো আছেই।

লেকের পাড়ের বিশ্রামঘর; সোর্সঃ Taslima Bably

ওখানে যারা কর্মী আছেন, তাদের থাকার ছোট্ট টিনের ঘর রয়েছে লেকের এক পাশেই। রয়েছে একটি মসজিদ আর বসে বিশ্রাম নেয়ার মতো ছনের মাচা। মসজিদটি থেকে আরেকটু সামনে হাঁটার পরেই অনেকটা উঁচুতে সিঁড়ি। অনেকগুলো সিঁড়ির ধাপ পেরিয়ে পৌঁছুতে হয় ঝুলন্ত সাঁকোটিতে। ঝুলন্ত সাঁকোতে হাঁটতে বরাবরই আমার খুব ভালো লাগে। হাঁটতে হাঁটতে চারপাশের সবুজ আর মেঘলা আকাশ দেখছিলাম। সাথে ক্যামেরায় সৌন্দর্য ধরে রাখার প্রচেষ্টা তো আছেই।

ঝুলন্ত সেতুটিতে থাকতেই হুট করে আকাশ কালো হয়ে গেলো। আমাদের পিচ্চি গাইডের সাথে তার আরেকটি বন্ধুও জুটেছিল। ওরা তাড়া দিলো, বললো বৃষ্টি নামবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। আমরা রওনা হলাম অটোরিকশার কাছে। এবার ওরা আমাদের রাস্তা দিয়ে না নিয়ে গিয়ে পাহাড়ি বাড়িঘরের মধ্যে দিয়েই নিয়ে গেলো। ওই রাস্তাটা আমার বেশি ভালো লেগেছিল।

সিঁড়ি থেকে ঝুলন্ত ব্রিজ; সোর্সঃ Taslima Bably

বৃষ্টি না শুরু হলে আরো কিছুক্ষণ লেকে থাকতাম। তবে তার জন্যে আফসোস নেই। পাহাড়ে গিয়ে এভাবে বৃষ্টি পাওয়া তো সৌভাগ্যের ব্যাপার। অটোরিকশার কাছে পৌঁছুনোর আগে বৃষ্টি নামলো। সেই বৃষ্টিতে ভিজবো না, তা তো হয় না। বৃষ্টিতে ভিজে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে অটোরিকশার কাছে পৌঁছালাম। এরপর ওখানের টং থেকে চা নিয়ে আবার ভিজতে ভিজতেই চায়ে চুমুক দিয়ে শেষ করলাম উপবন লেক ভ্রমণের।

এরপর আসার পথে আবার আগের মতোই প্রকৃতি উপভোগ করার সুযোগ পাওয়া। মাঝপথে নেমে রাস্তার পাশের ক্ষেতে কাজ করতে থাকা আদিবাসী মা, ছেলের সাথে গল্প করলাম কিছুক্ষণ। একবারে শেষে আবার যাত্রাবিরতি দিয়ে রাবার বাগানে ঢুকে রাবারও দেখে নিলাম। কোনোকিছুই যেন বাদ না পড়ে যায় সেই ব্যাপারে সদাসতর্ক থেকে শেষ করলাম চমৎকার সেদিনটির।

পাহাড়ের উপর থেকে লেকের একাংশ; সোর্সঃ Taslima Bably

যেভাবে যাবেন

কক্সবাজার গিয়ে নাইক্ষ্যংছড়ি উপবন লেকে যেতে হলে সবচেয়ে ভালো উপায় অটোরিকশা বা সিএনজি রিজার্ভ করে নিয়ে যাওয়া। সেক্ষেত্রে ট্যুরে মানুষ কম থাকলে অনেকটা খরচ পড়বে। এছাড়াও সুগন্ধা বিচের দিক থেকে পিকআপ ভ্যানে করে রামু বাইপাস গিয়ে সেখান থেকে সিএনজি বা অটোতে করে রামু উপজেলায়। তারপর হেঁটে বা রিকশায় করে পৌঁছুবেন নাইক্ষ্যংছড়ি উপবন লেকে।

অটো থেকে দেখা নাম নাজানা নদী; সোর্সঃ Taslima Bably

আর ঢাকা থেকে যেতে হলে যেকোনো কক্সবাজারগামী বাসে উঠে রামু বাইপাসে নেমে যেতে হবে। তারপর একবারে অটোরিকশা বা সিএনজি ভাড়া করে পৌঁছে যেতে পারেন উপবন লেকে। এছাড়াও কক্সবাজার থেকে যাওয়ার মতো বাইপাস থেকে ভেঙে ভেঙে একই উপায়ে পৌঁছে যেতে পারবেন। উপবন লেক তো আছেই, পৌঁছুনোর রাস্তাটিও আপনাকে নিয়ে যাবে প্রকৃতির কাছাকাছি।

Feature Image: Taslima Bably

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *