in

নৈসর্গিক ছাত্রুতে এক বেলার খাবার

স্পিতি ভ্যালি যাবার পথে ক’টা জায়গাতে দাঁড়িয়ে কিছু খেয়ে নেবার মতো ছোট্ট ৪ দোকানের একটা জায়গার নাম ছাত্রু। শত শত কিলোমিটার দুর্গম পথের মধ্যে এই জায়গাটাতেই সবাই বসে দুই মুঠো খেয়েআবার রওনা হয়ে যায় দুর্গম রাস্তার দিকে। রোথাং পাস থেকে নেমে মোটামুটি ৭০ কিলোমিটার সামনে এগোলেই পাওয়া যায় বিশাল সব পর্বতে ঘেরা অবাধ্য একটি নদী, নাম চন্দ্র নদী।

চন্দ্রতাল লেক থেকে গ্লেশিয়ারের গলা পানি গলে যে বিশাল পরিমাণ পানি প্রবাহিত হয়, সেই পানির কিছু অংশ এই চন্দ্র নদী দিয়েবয়ে যায় নিচের দিকে। এই নদীর ক্রসিংয়ে চোখে পড়ে ছোট্ট দুটো কাঠের ব্রিজ। আর ব্রিজ পার হলেই সামনে পড়ে ছাত্রু নামের জায়গাটি।

ছাত্রুতে নামার পথে। ছবিঃ লেখক 

মানালি থেকে স্পিতি ভ্যালি যেতে তিনটি উঁচু পাস পড়ে। প্রথমটি হলো রোথাং পাস, দ্বিতীয়টির নাম মনে নেই, তৃতীয় পাসটি হলো কুঞ্জম পাস। এর মধ্যে রোথাং পাস পার হবার পরই ছাত্রুর অবস্থান। আকাশে বেশ মেঘ ছিল সেদিন। গাড়ি ছাত্রু ব্রিজ অতিক্রম করার সময় দেখতে পেলাম চারটি ছোট্ট দোকান।

ড্রাইভার যখন গাড়ি থামাল তখন বেশ গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে বাইরে। উইন্ড ব্রেকারটা গায়ে চেপে নেমে পড়লাম। চারদিকে দিগন্ত বিস্তৃত ধূসর আর সারা রঙের পাথুরে পাহাড়। দুই একটা বিশাল পর্বতের গায়ের বিশাল গ্লেসিয়ারও চোখে পড়ছে ততক্ষণে। ভাবনায় এলো সভ্যতা থেকে এত দূরে, এত দুর্গম এলাকায় তীব্র শীতের মধ্যে স্থানীয়রা কীভাবে নিজেদের জীবন রক্ষা করে টিকে আছে শত শত বছর ধরে।

পাথুরে আর সবুজ পর্বতসারী। ছবিঃ লেখক 

ড্রাইভার বললেন ৩০ মিনিট সময় দেয়া হলো। এর মধ্যে খাবার দাবার ও টয়লেট সারার থাকলে দ্রুত সেরে নিতে। আবহাওয়া ক্রমশ খারাপ হচ্ছিল। সামনে পথ বন্ধ হয়ে যাবার ভয়ে উনি বেশ তাড়াহুড়ো করছিলেন। তাই জবুথবু হয়ে কোনোমতে শামিয়ানা টাঙানো দোকানের মধ্যে ঢুকলাম।

বেশ কিছু মেন্যু দেখলাম আর অবাকও হলাম। কম খরচে আছে ডাল, ভাত আর সেই সাথে সয়াবিন ভাজি। এত দূরে এসে যে ভাত পাব সেটা আমায় বেশ অবাক করেছিল। যেহেতু খরচ কমানোর চেষ্টা করছিলাম তাই রাজমা ডাল আর ভাতের অর্ডার দিয়ে বাইরে একটা চেয়ার দখল করে বসে গেলাম।

খাবার মহাযজ্ঞ চলছে। ছবিঃ মহিউদ্দিন মাহি 

চারদিকে তাকিয়ে আসলে সারা জীবন কাটিয়ে দেয়া যায়। আকাশ ছোয়া পর্বতগুলোর মাথা দিয়ে উড়ে যাচ্ছে সাদা সাদা মেঘের দল, সেই সাথে হাড় কাঁপানো শীতের বাতাস। শোনা যাচ্ছে চন্দ্র নদীর বিকট গর্জন। এই গর্জন শুনে ইচ্ছে হলো কাছে গিয়ে একটু দেখে আসি, উঠতে যাব তখনি খাবার এলো।

এই তীব্র ঠাণ্ডার মধ্যে ধোঁয়া ওঠা ভাত আর ডাল দেখেই যেন অর্ধেক মন ভরে যায়। ভয়ে ভয়ে গালে তুললাম খাবার। নাহ, যতটা বাজে আশা করেছিলাম খাবার তার থেকেও মধুর লাগছিলো। তাছাড়া খিদেও পেয়েছিলো বড্ড। চারদিকে দাঁড়ানো পর্বত সারির মধ্যেখানে বসে বন্য নদীর ভয়ংকর গর্জন শুনতে শুনতে যে খাবার খেয়েছে, সে ছাড়া এই অনুভূতি কেউ বুঝবে না।

ওর নাম লাকপা। ছবিঃ মহিউদ্দিন মাহি 

এই অঞ্চলে মূলত মানুষ ধানের চাষ কম করে। এগুলো ভারতের অনান্য রাজ্যগুলো থেকে আসে। স্পিতিতে সবচেয়ে বেশী ও প্রধান খাবার হিসেবে জায়গা করে আছে গমের রুটি। বেশ কিছু জায়গাতে গমের ক্ষেত চোখে পড়েছে। তবুও ভাতের স্বাদ অসাধারণ লাগছিলো। বেশ কিছু পাহাড়ি লোমশ কুকুর এসে পায়ের সাথে মাথা ঘষাঘষি শুরু করেছে ততক্ষণে।

কুকুর আমার বরাবরই সব থেকে পছন্দের প্রাণী। ওদেরকে বেশ কিছু সয়া নাগেট দিলাম। মাটিতে দিলে ওনারা আবার সেদিকে চেয়ে দেখেন না তাই ওদের জন্য রাখা পাত্রেই দিলাম। শীতের মধ্যে খাবার জুড়াতেও খুব বেশী সময় নিলো না। একটা সময় আর খাওয়ার মত ছিল না। তবুও জোর করে খেয়ে নিলাম পুরো প্লেট।

পর্বতের কোলে ছাত্রু ব্রিজ। ছবিঃ লেখক। 

খাবার পর ভাবলাম আশেপাশের কোনো টয়লেট থেকে ফ্রেশ হয়ে গাড়িতে উঠব। দোকানির কাছে জিজ্ঞেস করলাম টয়লেট কোনদিক। উনি বললেন, কোয়ি টয়লেট নেহি হে ইধার, ফ্রি টয়লেট। আমি কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। মনে একটাই প্রশ্ন, এই কাজ এখন আমি এই শীতের মধ্যে খোলা জায়গায় কীভাবে করব!

কিন্তু উপায় ছিল না। জায়গা খুঁজতে লাগলাম কোথায় করব। পরে ভাবলাম নদীর দিকটায় একবার যাই। যখন হাঁটতে হাঁটতে নদীর দিকে এগোচ্ছি, বিশাল গর্জনের শব্দে ভয় ধরে যাচ্ছে মগজে। পাশে পৌঁছাতে দেখলাম বিশাল আকারের সব পাথরের বোল্ডারের উপর দিয়ে সাই সাই করে ছুটে যাচ্ছে বরফ গলা হীম শীতল স্রোত।

নদী পাহাড়ের কোলে ছাত্রুতে ক্যাম্পিং। ছবিঃ মহিউদ্দিন মাহি 

নদীর পানি ছোঁয়া তো দূরের কথা, নদীর পাশেই থাকতে সাহসে কুলাচ্ছিল না তখন। ব্রিজের দিকে কোনো মানুষ না দেখে ব্রিজের নিচেই বসে পড়লাম। পাশাপাশি দুটো ব্রিজ। ভয় হচ্ছিল কখন গাড়ি ভরা লোক যায় এই ব্রিজের উপর দিয়ে, না জানি মান ইজ্জতের টানাটানি না হয়। কী আর করা, এক বুক সাহস নিয়ে বসে গেলাম ব্রিজের নিচেই।

ভাগ্য ভালো ছিল। আমি বেশ নিরিবিলি কর্ম সম্পাদন করে গাড়ির সামনে ফিরে এলাম। ড্রাইভার হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করলে, টয়লেট মিলা কোয়ি? আমি হাসতে হাসতে আমার প্রথম অভিজ্ঞতা বর্ণনা করলাম। পাশে দাঁড়িয়ে বেশ কয়েকজন উচ্চস্বরে হাসছিলেন আমার বর্ণনার ভঙ্গী দেখে।

খাবার পর স্পিতির উদ্দেশ্যে যাত্রা। ছবিঃ লেখক  

ভালোভাবেই সব পর্ব শেষ করে গাড়িতে উঠলাম। চারপাশের এই প্রকৃতির মাঝে যে কাজই করা হোক না কেন সেটা দারুণ উপভোগ্য হয়ে ওঠে মাঝে মাঝে। ভ্রমণের সাথে নিজেকে না জড়ালে জীবনের এই শান্তিটুকু কখনই পেতাম না। 

কীভাবে যাবেন ও খরচের খসড়া:

স্পিতি ভ্যালি যেতে হলে আপনার দরকার হবে একটি ভারতীয় ভিসা। যে কোনো পোর্ট দিয়ে প্রবেশ করে কলকাতা থেকে ট্রেন, বাস বা বিমানে যেতে হবে দিল্লি অথবা চণ্ডীগড়।ট্রেনে শ্রেণীভেদে দিল্লি বা চণ্ডীগড়ের ভাড়া পড়বে ৬৭৫ থেকে ৩,৫০০ রুপি। বিমানে পড়বে ২,৪০০ থেকে ১২,০০০ রুপি।  এই জায়গাগুলো থেকে বাস পাওয়া যাবে মানালির। বাস ভাড়া পড়বে ৪৯০ রুপি থেকে ১,৪০০ রুপি।

মানালি থেকে কাজা গামি একটি HRTC এর লোকাল বাস চলাচল করে বছরে ছয় মাস ভোর পাঁচটায়, এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। বাস ভাড়া ৩০০ রুপি। অথবা ট্যাক্সি ভাড়া করে সরাসরি চলে যেতে পারেন কাজায়। যাবার পথেই পড়বে ছাত্রু। ভাড়া পড়বে ৮০০ রুপি শেয়ারে গেলে, আর পুরো ট্যক্সি ভাড়া করলে পড়বে ট্যক্সির ধরন অনুয়ায়ী ৬,০০০-১০,০০০ রুপি। HRTC এর বাসের টিকেট যাবার ন্যূনতম দুই দিন আগে ও ট্যাক্সি ভাড়া করতে হবে যাত্রার আগের দিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *