in

নো ম্যান্স ল্যান্ডে অধরা অথবা অরণ্যর বন্ধুরা

কে যাবে আর কে থাকবে এ নিয়ে বন্ধুদের সাথে অনেক বিতর্ক আর মনোমালিন্য হলো শেষ পর্যন্ত। কে থাকবে আর কে থাকবে না সে অরণ্য জানে না, আর জানতেও চায় না! অরণ্য এখনই মানে আগামী দুই একদিনের মধ্যে এই তেতুলিয়া, চা বাগান আর সেই বাগানের মায়া ছেড়ে যাবে না, সেটা জানিয়ে দিল স্পষ্ট করে।

ব্যস এরপর যা হবার তাই হলো, পরদিন সকালে ওর বন্ধুরা চলে যাবে তাই টিকেট কাটল বিকেলে আর অরণ্য সারাদিন রুমে শুয়ে বসে থেকে মহানন্দার পাড়ে সময় কাটিয়ে বিকেল হতেই সেই মায়ায় মাতাল করা সবুজ চা বাগানের রঙিন আহ্বানে!

অধরা দাঁড়িয়ে ছিল “নো ম্যান্স ল্যান্ডে”, তাই দেখে অরণ্য অভিভূত! তবে কি অধরারও একই রকম আকর্ষণ আছে! কি জানি, নেই হয়তো? তবে দাঁড়িয়ে ছিল কেন? নিজের কাছেই নিজের জিজ্ঞাসা। এভাবে “নো ম্যান্স ল্যান্ডে” কিছুটা আড়ালে ওরা দেখা করলো পরের দুই দিন সকালে আর বিকেলে পালা করে। একজন কাটা তাঁরের ওপারে আর একজন এপারে! বিনিময় হলো দুজনের মোবাইল নাম্বার আর অতি আবশ্যিকভাবেই আজকালকার সবচেয়ে সহজ যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক আইডি!

তাই দেখা দুই বেলা হলেও কথা হতে থাকলো সারাক্ষণই! তিনদিনেই ওরা জেনে গেল একে অন্যের অনেক অনেক কিছুই। টানও জন্মালো একের প্রতি অন্যের! এরপর ফিরে যাবার সময় হলো দুজনেরই। যার যার জায়গায়, যার যার আবাসে, ছেড়ে ওদের বন্ধুত্বের আর আবেগের সবুজভূমি “নো ম্যান্স ল্যান্ড”।

বিকেলের সোনা রোদে চা বাগান। ছবিঃ সংগ্রহ 

ফিরে ওরা গেল ঠিক-ই, কিন্তু বন্ধুত্ব, যোগাযোগ আর নিয়মিত খোঁজখবর থেমে নেই একদিনের জন্যও! ফেসবুক আছে না! অধরার কতটা কি অবস্থা জানে না তেমন, কিন্তু অরণ্য হন্যে হয়ে উঠলো ভারত যাবে। অধরাও সম্মত ভারতে যেতে পারলে ঘুরে বেড়াবে অরণ্যর সাথে। জলপাইগুড়ি থেকে ওরা যাবে কাছেই দার্জিলিং, সেখান থেকে রিশপ-লাভা আর শেষ বেলায় ঘুরে আসবে টুমলিং হয়ে সান্দাকফু! অধরার একা একা বন্ধুদের সাথে বাইরে যাবার তেমন একটা বাঁধা নেই। আর ওদিকে চেনা-জানা বন্ধু আর আত্মীয়ও আছে ওর। তাই শুধু অরণ্য যেতে পারলেই হয়!

অনেক অনেক চেষ্টা করে অরণ্য কোনোভাবেই ভিসা করতে পারে না! ফরম পূরণ করে তো, জমার তারিখ পায় না, জমার তারিখ কোনোভাবে নিতে পারে তো এম্বাসি তেমন কোনো কারণ না দেখিয়ে পাসপোর্ট জমা রাখে না, আবার কখনো জমা রাখে তো, কোনো কারণ ছাড়াই ভিসা দেয় না! এক অসম্ভব, অদ্ভুত আর নিদারুণ পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে যায় অরণ্য! ভারত যাবার জন্য, অধরাকে কাছ থেকে দেখার জন্য, ওর সাথে সান্দাকফু যাবার জন্য ছটফট করে সারাক্ষণ, কিন্তু ভিসা জটিলতা কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না অরণ্যর!

একটি ভিসার জন্য প্রায় পাগল হয়ে ওঠে অরণ্য, এখানে সাহায্য চায়, ওখানে সাহায্য চায় কিন্তু সহজ কোনো সমাধান সে পায় না। অবশেষে বেশ কিছু টাকা দিয়ে, দালাল ধরে একটি ফরম পূরণ করে জমা দানের তাখির পায়, কিন্তু সেই বারও ভিসা না পেয়ে এম্বাসিতে ঝামেলা করে অনেক অনেক! এমনকি পুলিশী হয়রানীর শিকারও হতে হয় পাসপোর্ট জব্দ করে! অপদস্ত করে অনেকভাবে। তাই বিমর্ষ অরণ্য অধরাকে জানায় সে আর আসতে পারছে না ভারতে। ভিসা পাচ্ছে না আর হয়তো পাবেও না সহসা।

সবুজে সন্ধ্যার আগমন। ছবিঃ সংগ্রহ 

সব জেনে অধরার মন ভেঙে যায়, সে ব্যাকুল হয়ে ওঠে অরণ্যকে দেখতে, কথা বলতে, পাশাপাশি হাঁটতে আর সবুজ প্রকৃতির মাঝে বসে রঙিন স্বপ্ন দেখতে! নাহ, এই ফেসবুক-হোয়াটস অ্যাপ বা ভাইবারে নয়, সামনা সামনি দেখতে চায় অরণ্যকে! কিন্তু কীভাবে? শেষমেশ অধরার পরামর্শ আর ব্যাকুলতার কাছে হার মেনে ওরা আবার তেতুলিয়ার সেই “নো ম্যান্স ল্যান্ডে” দেখা করার জন্য ঠিক করে।

অরণ্য কোনোক্রমে ছুটি নিয়ে ছুটে যায় অধরার কাছে! দেখা হয় ঠিক আগের মতোই, সেই “নো ম্যান্স ল্যান্ডে”, কাঁটাতারের দুইপাশে দুইজন, ক্ষণিকের আয়োজন যা ওদেরকে আরও অস্থির আর উন্মাদ করে তোলে! কাছে পেতে, পাশে বসতে, হাত ধরে হাঁটতে, সবুজের মাঝে হারিয়ে যেতে! কিন্তু বাধা? সেই কাঁটাতার! এ যেন “সীমান্তে নয়, হৃদয়ে কাঁটাতার!”

আবারো ফিরে যায় ওরা ওদের নিজ নিজ আবাসে! অধরা অরণ্যকে আবারো চেষ্টা করতে বলে ভিসা পেতে আর ভারতে যেতে! অরণ্য ফিরে এসে আবারো হন্যে হয়ে ওঠে ভারতের ভিসা পেতে! কিন্তু এখন সমস্যা আরও প্রকট হয়ে দেখা দেয়, আগে যেখানে কিছু টাকা দিয়ে ভিসার নেবার বা পাসপোর্ট জমা দেবার তারিখ পাওয়া যেত, সেটা এখন বেড়ে গেছে বহুগুণ! তাও সেই টাকা দিয়েও ভিসা পাবে কি পাবে না সেই নিশ্চয়তা নেই!

অথচ অধরা আর অরণ্যর প্রাথমিক সেই বন্ধুত্ব এখন আর শুধু বন্ধুত্বে সীমাবদ্ধ নেই। হয়ে গেছে ভালো লাগা, ভীষণ ভালো লাগা থেকে ভালোবাসা আর ভালোবাসা থেকে ওরা বাধা পড়েছে একে অন্যের এক আকুল প্রেমের বাঁধনে! কেউ কাউকে ছাড়া থাকতে পারে না আর চায়ও না! ওদের সমস্ত অবসর এখন শুধুই দুইজনের! একান্তে কথা বলার, হাসার-কাঁদার-বেদনার আর কবে ভিসা নিয়ে একে অন্যের কাছে যেতে পারবে সেই স্বপ্নের!

অরণ্যর এইসব ছেলেমানুষী আর ভীষণ পাগলামি দেখে ওর বন্ধুরা বিভিন্নভাবে উপায় খুঁজতে থাকে কীভাবে ভারতের ভিসা পাওয়া যেতে পারে কিছুটা সহজে! তাই আজকালকার বিভিন্ন ভ্রমণ গ্রুপে খবর নিতে থাকে আর বিভিন্ন উপায় বের করার সাহায্য চায়।

ফেরার পথে। ছবিঃ সংগ্রহ 

ধীরে ধীরে অরণ্য আর অধরার এই অবাধ্য ভালোবাসা জেনে যেতে থাকে একে একে সবাই, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে! আর এরই প্রভাবে একদিন একটি বড় ট্র্যাভেল গ্রুপ থেকে গণ মেইল কর্মসূচীর আয়োজন করা হয়! ভারতীয় এম্বাসিতে হাজার নয়, লাখ লাখ মেইল পড়তে থাকে ভিসা সহজীকরণের জন্য, দুর্নীতি আর অনিয়মের বেড়াজাল থেকে ভিসা প্রক্রিয়াকে মুক্ত করার জন্য! যা নজরে আসে বিবিসির মতো গুরুত্বপূর্ণ সংবাদমাধ্যমের! যে সংবাদ প্রচারে টনক নড়ে ভারতীয় কর্তা ব্যক্তিদের।

তাই তারা ঘোষণা দিয়েছে এম্বাসির নতুন ভবন উদ্বোধন উপলক্ষে কিছু দিনের জন্য ভিসা প্রক্রিয়াকে সহজ করবে, কোনো তারিখ ছাড়াই ফরম পূরণ করে জমা দিলেই মিলবে বা মিলতে পারে ভারতের ভিসা! আর এই খবরে আনন্দে-উচ্ছ্বাসে আর আবেগে আত্মহারা অরণ্য আর অধরা!

দেখা হবে, কথা হবে, পাশাপাশি বসা হবে, হাতে হাত রাখা হবে, ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখা যাবে, আর হারিয়ে যাওয়া যাবে দুজন দুজনের মাঝে।

সবুজে আবাসে। ছবিঃ সংগ্রহ 

কোনো এক পাহাড়ে অথবা অরণ্যে, সমুদ্রে না হয় বরফের রাজ্যে!

হবে কি অরণ্য আর অধরার অপেক্ষার অবসান? পেয়ে ভিসা, গিয়ে ভারতে, এড়িয়ে কাঁটাতারের বাঁধা আর “নো ম্যান্স ল্যান্ড”?

কে জানে?

তাই আপাতত শুধুই অপেক্ষা আর অপেক্ষা….

অরণ্য আর অধরার ভালোবাসার, কাছে পাবার, অজানায় হারাবার……

(চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *