in

পাহাড়প্রেম: কেওক্রাডং জয়ের গল্প

ভোরের আলো ফোটেনি তখনও। আমরা বগালেকের কাছাকাছি একটি কটেজে রাত কাটিয়েছি। প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় প্রায় জমে যাওয়ার মতো অবস্থা। তবে শোবার ব্যবস্থা বেশ ভালো ছিল।

হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডায় দাঁতে দাঁত লেগে উদ্ভট আওয়াজ হচ্ছিলো। কাঁপতে কাঁপতেই ছোট্ট দরজা সরিয়ে কটেজের বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। এই দৃশ্য দেখে আনন্দে চিৎকার করার মতো অবস্থা। তবে ঠাণ্ডায় হাত, পা এবং শরীরের মতো গলার স্বরও প্রায় জমে গিয়েছে।

পাহাড়ের দেখা; সোর্স: লেখিকা

আমি তখন দাঁড়িয়ে ছিলাম বাঁশ কেটে তৈরি ছোট্ট, সুন্দর একটি কটেজের বারান্দায়। কটেজটি দাঁড়িয়ে আছে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য আর রহস্য ঘেরা বগালেকের পাড় ঘেঁষে। সামনে তাকালেই চোখে পড়ে বগালেকের নীলচে-সবুজাভ জলরাশি। তার থেকে দৃষ্টি কিছুটা এগিয়ে নিলেই বিশাল সব পাহাড়। আর পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ঝুলে থাকা শুভ্র মেঘমালা ও কুয়াশার ভারী চাদর। এই সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে আনন্দের একটি চিৎকার গলা বেয়ে উঠে আসতে চাইতেই পারে, তাই না?

তবে আমরা এ সৌন্দর্যে খুব বেশি সময় খরচ করতে পারলাম না। কারণ আমাদের উদ্দেশ্য তখন কেওক্রাডং জয় করা। কেওক্রাডং, বাংলাদেশের পঞ্চম সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ।বান্দরবানের রুমা উপজেলায় অবস্থিত এই পাহাড়টির উচ্চতা ৩,১৭২ ফুট। এক সময় এটিই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে আধুনিক গবেষণায় এই তথ্য ভুল প্রমাণিত হয়েছে (বর্তমানে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ সাকাহাফং বা মদক তুং)।

পাহাড়ি পথে যাত্রা; সোর্স: সানজিদা আলম ইভা

এর আগের দিন বগালেকের আগে ২ কিলোমিটার খাড়া পাহাড় পায়ে হেঁটে আসার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা মনে করেই আমরা ঘাবড়ে যাচ্ছিলাম। তাছাড়া এবারের ট্যুরে আসা আমাদের কারোই এর আগে পাহাড় ট্রেকিংয়ের অভিজ্ঞতা নেই। তাই আমাদের যাত্রাটা আরো কঠিন। যত দ্রুত সম্ভব হালকা নাস্তা করে আমরা আমাদের যাত্রা শুরু করলাম সকাল ৮টায়।

এখানকার যেদিকেই চোখ যায় পুরো এলাকাটিই পাহাড়। আমরা পাহাড় বেয়ে এগিয়ে চললাম পাহাড়ের চূড়া ছুঁতে। সবার হাতে ছোট ছোট বাঁশ। যে যার নিজস্ব উচ্চতা অনুযায়ী মাপ মতো বাঁশ সাথে নিয়ে নিয়েছিলাম। কারণ পাহাড়ি পথে চলতে এটি খুব প্রয়োজনীয় একটি জিনিস।

অসাধারণ সৌন্দর্যের হাতছানি; সোর্স: সানজিদা আলম ইভা

পাহাড়ি বিশাল রাস্তাটি কিছুদূর যেতেই তার রূপ পাল্টে নিলো। আমাদের যাত্রা শুরু হলো গাছপালা ঘেরা সরু পথ ধরে। পথটি কখনো খাড়া, কখনো বেশ ঢালু হয়ে এগিয়ে গেছে। কখনো কখনো সমতলও পেলাম আমরা। তবে সেই সুখকর পথ বেশিক্ষণ স্থায়ী হচ্ছিলো না।

দীর্ঘ এই পথে যখন ক্লান্তিতে সবার অবস্থা বেশ খারাপ, তখন জীবনানন্দের বিখ্যাত কবিতার সেই বনলতা সেনের মতো আমাদের দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিলো পাহাড় বেয়ে সুর তুলে নেমে আসা ‘চিংড়ি ঝর্ণা’ নামক ঝর্ণাটি। অনেক দূর থেকেই ঝর্ণার মনোমুগ্ধকর আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম আমরা। আর ঝর্ণার কাছাকাছি আসতেই যে অদ্ভুত শীতলতা টের পেয়েছিলাম তা লিখে প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

চিংড়ি ঝর্ণার জলরাশি ছুঁয়ে; সোর্স: সানজিদা আলম ইভা

এই ঝর্ণা বেয়ে নেমে আসা জলে চিংড়ি পাওয়া যায় বলে স্থানীয়ভাবে এই ঝর্ণাটি চিংড়ি ঝর্ণা নামেই পরিচিত। শীতকাল হলেও চিংড়ি ঝর্ণায় তখনও বেশ জলের দেখা পাওয়া গেলো। তবে স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, বর্ষায় এই ঝর্ণার আসল সৌন্দর্য দেখা যায়। তখন জলের পরিমাণ আরো বেশি থাকে। তবে শীতের সকালে যাত্রা শুরু করে এমন ঘেমে-নেয়ে একাকার হওয়া বেলায় এই সুর তোলা, শীতলতা দেয়া অল্প জল নামানো ঝর্ণাই আমাদের বেশ ভালো লাগলো।

আধা ঘণ্টা সময় ঝর্ণায় কাটিয়ে আমরা আবার আমাদের যাত্রা শুরু করলাম। পাহাড়ি পথ ধরে চলতে গিয়ে পথের দুই ধার থেকে দেখা পেলাম নাম না জানা আরো অসংখ্য পাহাড়ের। তাছাড়া মেঘ, পাহাড়, সবুজের সমারোহের সঙ্গে আকাশের মিশেল যে অপরূপ সব দৃশ্যের দেখা মিলিয়েছিলো তা লেখা পড়ে নয়, শুধুমাত্র সেই জায়গাগুলোতে গিয়েই উপলব্ধি করা সম্ভব।

অসংখ্য পাহাড় মিলেছে যেখানে; সোর্স: লেখিকা

পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় যাত্রাটি বেশ কঠিন হলো আমাদের। তবে ইচ্ছে শক্তি আর প্রকৃতির মোহ ঠিক আমাদের টেনে নিল কেওক্রাডংয়ের চূড়া অবধি। সকাল ৮টায় যাত্রা শুরু করে কেওক্রাডং যখন পৌঁছালাম তখন ঘড়িতে বেলা আড়াইটা। প্রায় সাড়ে ৬ ঘণ্টা লাগলো আমাদের ট্রেকিংটি শেষ করতে।

চূড়ায় উঠতে পারার আনন্দের পাশাপাশি প্রচণ্ড ক্ষুধাও উপস্থিতি জানান দিচ্ছিলো। পূর্বেই প্ল্যান করা ছিল আমরা কেওক্রাডংয়ের চূড়ায় এক রাত থেকে যাবো। তাই তাড়াহুড়ো না করে কটেজে উঠে গেলাম সবাই। গোসল, দুপুরের লাঞ্চ ও খানিকটা বিশ্রাম নিতে ব্যয় করলাম ঘণ্টা তিনেক।

কেওক্রাডংয়ের চূড়ায়; সোর্স: সানজিদা আলম ইভা

চূড়ার একটি অংশে সাধারণ ভ্রমণকারীদের থাকার স্থান ও অন্য একটি অংশে আর্মি ক্যাম্প। সন্ধ্যায় আমরা আর্মি ক্যাম্পের অংশে গিয়ে বসলাম। দেখা পেলাম আমাদের মতো আরো অনেক ভ্রমণ পিপাসুর। একই আকাশে একপাশে সূর্য ডুবে যাওয়ার ও অন্য পাশে চাঁদ ওঠার এমন অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য আমি এর আগে কখনোই দেখিনি।

অবাক আর বিস্ময়ের পাশাপাশি অনেকটা আনন্দ আর গানে মুখরিত হয়ে রাত ১০টা অবধি আমাদের এই আর্মি ক্যাম্পেই কেটে গেলো। তারপর আর বেশি সময় না ব্যয় করে সবাই ঘুমিয়ে নিলাম। পায়ে ব্যথা আর ক্লান্তিতে জেগে থাকারও উপায় ছিল না যদিও। তাছাড়া পরের দিন বেশ ভোরেই আবার ফেরার পথ ধরার কথা। যেই পথটা শেষ হয়েছিল একেবারে ঢাকায় ফিরে, যার যার গন্তব্যে পৌঁছে।

যাওয়ার উপায়:

আমরা ঢাকার ফকিরাপুল বাস কাউন্টার থেকে গিয়েছিলাম ইউনিক বাসে। ঢাকা থেকে সরাসরি বান্দরবান বাস ভাড়া ৬২০ টাকা। বান্দরবান শহর থেকে চান্দের গাড়ি, জিপগাড়ি বা লোকাল বাসে যেতে পারবেন রুমা বাজার। লোকাল বাসে বান্দরবান থেকে রুমা বাজার জনপ্রতি ভাড়া ১১০ টাকা।

রুমা থেকে জিপগাড়ি বা চান্দের গাড়ি ভাড়া করে যেতে হবে কমলা বাজার। রুমা বাজার থেকে ভেতরে যেতে আপনাকে গাইড সাথে নিতে হবে। রুমা বাজার পৌঁছে স্থানীয়দের সাথে কথা বললেই গাইড পেয়ে যাবেন। গাইডের ভাড়া প্রতিদিনের হিসেবে ৪০০-৬০০ টাকা। এছাড়া পথে গাইডের যাবতীয় খরচ আপনাদের বহন করতে হবে।

আমরা যে গাইড নিয়েছিলাম তিনি বেশ ভালো। প্রয়োজনে রুমা বাজার গিয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।

গাইড: ০১৮২৮৮৪২৯৭৭ (তাওহিদ)

রুমা বাজার থেকে গাড়িতে যেতে পারবেন কমলা বাজার পর্যন্ত। এরপর বাকি পথ পায়ে হাঁটার।

যেখানে থাকবেন:

চাইলে বগা লেকে রাতে থাকতে পারবেন বা কেওক্রাডংয়ের চূড়াতেও। সেখানে অল্প সংখ্যক কটেজ রয়েছে। কটেজে থাকার জন্য জনপ্রতি খরচ করতে হবে ১৫০ টাকা (এক রাতের জন্য)। মাঝারি আকারের কটেজে এক সঙ্গে থাকতে পারে ১৫-২০ জন।

ফিচার ইমেজ- সানজিদা আলম ইভা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *