in

শঙ্খ যাত্রা

বান্দরবানের থানচি উপজেলার সর্ব দক্ষিণ-পূর্বের একটি গ্রাম, লাগপাই (বুলু)পাড়া থেকে কয়েক ঘণ্টা হাঁটাপথে বাংলাদেশ-মিয়ানমার দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে মদক রেঞ্জের বাংলাদেশিয় অংশে, কোনো এক প্রাকৃতিক জল নিষ্কাশন ক্ষেত্র থেকে শংখছড়ার গোড়াপত্তন। এই ছড়া ধরে শুরু হয় এই শংখ নদীর যাত্রা। মদক রেঞ্জের এই মাতৃঝিরি ছাড়াও ঠিক বিপরীত পাশের আরো কিছু ছোট ঝিরি মিলে লাগপাই পাড়া এসে পৌঁছায়।

‌ এই পাহাড়ি পাড়াটির পাশেই একটি ঝিরি রয়েছে যার নাম লাগপাই ঝিরি, এটিও শংখের যাত্রায় সামিল হয়। এ অঞ্চলটা খুবই দুর্গম তাই সভ্যতার বিকাশ আর নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত অধিবাসিরা। বসতি অধিকাংশ মুরং আদিবাসী ছাড়াও ত্রিপুরা, রাখাইন পরিবার ও একটি তঞ্চংগ্যা পরিবারও থাকে, যারা কর্তাপাড়ার ৫০টি শিশুকে প্রাথমিক পাঠদান করেন। বিনিময়ে পান ১ কলস ধান প্রত্যেক শিশুর পরিবার থেকে আর কিছু অর্থ।

লাগপাই পাড়া,বাংলাদেশের অন্যতম দুর্গম পাড়া ছবিঃ তৌফিক তমাল

পাড়ার লোকজনদের আত্মীয়তা সীমারেখা পেরিয়ে যায় কারণ পাড়াটির তিন দিকেই মিয়ানমার। নিকটবর্তী বাজার সীমারেখার বাইরে, কিন্তু সাথে রয়েছে চেনা সব বিপদ, তাই একদিনের হাঁটাপথের লিক্রি পাড়াই উত্তম। প্রায়শই যেতে হয় ৩/৪ দিনের পথ পাড়ি দিয়ে সুদূর মদকে, থানচি তো আয়ত্বের সীমা পেরিয়ে। জীবিকা বলতে ঐ জুম,আমিষ বলতে শিকার ও সামান্য কিছু গবাদী পশু পালন।

কিন্তু একটি মজার ব্যাপার হলো, এটি সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন গ্রাম হওয়া স্বত্বেও সংরক্ষিত প্রাণী শিকারের ব্যাপারে এই গ্রামের মানুষ কিছুটা সচেতন। চিকিৎসার জন্য বিজিবি ছাড়া অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য পথ নেই। পাড়াটি এতটাই দুর্গম যে বিজিবিদের রেশন হেলিতে পৌঁছায়। লাগপাই পাড়ার কারবারির (প্রধান) নাম বুলু তাই পাড়াটিকে এখন বুলু পাড়া নামেই ডাকা হয়।

লাগপাইপাড়ায় সাংগু/শংখ নদী/শংখছড়া। ছবিঃ তৌফিক তমাল

একে বান্দরবানের সর্ব দক্ষিণের পাড়া হিসেবে জানা গেলেও প্রায় বছর হয়ে গেছে আরো দক্ষিণে বুলুপাড়া থেকে ৫/৬টি পরিবার নিয়ে আরেকটি পাড়া (নয়া পাড়া) গড়ে উঠেছে।বুলুপাড়া, পানঝিরি পাড়া, তাংখোইপাড়া, নয়াপাড়া এই চারটি পাড়ার লোকজনের বুলুপাড়া বিজিবি ক্যাম্পের অধিকারিদের সাথে এক নিবিড় সম্পর্ক। পাড়ার লোকজনদের সুখে-দুঃখে তারা চিকিৎসা সহ সম্ভাব্য বিভিন্ন সুবিধা দান করে থাকেন।

পানঝিরি পাড়া। ছবিঃ তৌফিক তমাল

সাংগু রিজার্ভ ফরেস্ট এরিয়া এক রহস্য ঘেরা অঞ্চল, এই অঞ্চলে দুর্লভ বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ বন্য প্রাণী, পাখি, সাপ, কচ্ছপ, বনরুই, হরিন, বানর, মেছোবাঘ, ভাল্লুক আর রয়েছে হাতির আধিক্য। তাই হয়তো পাড়া থেকে উঁচু গাছগুলোর ফাঁক দিয়ে ত্রিভুজ আকৃতির মদকরেঞ্জের সর্বশেষ উচু পাহাড়, নাসাইহুম/হাতিপাহাড় (৩,০০৫ ফিট) দেখা যায়।

বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্গমতম ৩০০০ফিটের পাহাড়। ছবিঃ তৌফিক তমাল

তাছাড়াও তিন পাশ সীমান্তঘেরা হওয়ায় সীমান্ত রক্ষীদের নিরন্তন ব্যস্ততা, টহল চলমান। আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে, আমার সবচেয়ে পছন্দের মুরং/ম্রো সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠী, কারণ তারা আধুনিকতা আর যান্ত্রিক কোলাহলময় পৃথিবী ছেড়ে নিজেদের সংস্কৃতি লালনে বেশী ব্যস্ত।

বসবাস করেন দুর্গমতম পাড়াগুলোতে বা একটু গহীনে। এই পাড়া এবং আশপাশের সব পাড়াই মুরংপাড়া। বুলু কারবারির ঘরে একটি দিন কাটিয়েছিলাম, এ যেন সংগীত শালা। বাঁশ-কাঠ-লাউ দিয়ে বানানো আজব সব বাদ্যযন্ত্র। সত্যিকারের ফোক মিউজিক বলা চলে, যা শোনার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করাতে বুলু দা জানালেন, গতকাল নাকি তাদের বিরাট এক উৎসব শেষ হলো, যাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পাড়ার লোকজন, দুর-দুরান্ত থেকে এসে মিলিত হয়েছেন।

মাছখুম এলাকা-সাংগু নদী। ছবিঃ তৌফিক তমাল

সারারাত অনুষ্ঠান চলেছিল, ঐতিহ্যগত পোশাক, রীতি, খাবার, পানীয়, নাচ, গানে একটা “মিউজিকাল ফেস্ট” গিয়েছিল। উনার গল্পের ভাষ্যেই হারিয়ে গিয়েছিলাম, দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো। অলস দুপুরের আড্ডায় সময় পার করছিলাম।

দাদারা তামাক টান দিচ্ছিলো আর মিয়ানমারের কী যেন একটা গান উনাদের খুব প্রিয় হয়তো, বারবার মোবাইলে শুনছিলেন, আর সে কি আবেগ উনাদের। খুব আগ্রহের সাথে দাদার কাছে বাংলা তরজমা/অনুবাদের অনুরোধ করলাম। উনি যা বললেন, ভাঙা বাংলায়-

“আমি একটা ভালো মেয়ে, তুমি কেন বুঝলে না। তোমার বাবা কেন আমাকে, তোমার বউ বানালো না।”

সাংগু নদী ও মাঝি। ছবিঃ তৌফিক তমাল

যা হোক হাসি পাচ্ছিলো খুব তবে তা পেটেই চেপে রাখলাম। পাড়ায় কোনো নারীদের আনাগোনা নেই, ২/১ জন বয়োজ্যেষ্ঠ ছাড়া। বুঝলাম সবাই জুমে গেছে, এটাও আদিবাসী সম্প্রদায়ের একটা আজব রীতি, নারীরা গৃহস্থালি কাজের পাশাপাশি জুম চাষও করেন, বাচ্চার দেখাশুনাও করেন। বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো, সূর্য মামা পশ্চিমের চিম্বুক রেঞ্জের দিগন্ত রেখায়, সাংগু রিজার্ভ ফরেস্টের বিশাল সব গাছের ফাঁকে মুখ লুকিয়ে গেলেন।

কিছুক্ষণ পর ফিরে আসলেন পাড়ায় একদল যুবক, ঝুড়ি আর গামলা সহ। খুব আগ্রহের সাথে দেখতে গেলাম, কী আনলেন শিকার করে, পাড়ার সকল ছোট-বাচ্চাগুলোও আরো অধিক আগ্রহে ছুটে গেলো, দেখলাম, দাদারা প্রচুর পরিমাণে মৌচাক সমেত মধু নিয়ে আসলেন, বাচ্চারা হাত বাড়ালো সাথে আমিও। আহা.. আজীবন মধুর ঐ স্বাদ ভুলবার জো আমার নেই।

লাগপাইপাড়ার সংগৃহীতমধু। ছবিঃ তৌফিক তমাল

চুলায় গলিয়ে আর হাতে চেপে বোতল ভর্তি করছিলেন, কিন্তু ভরপুর খাওয়া-দাওয়ার পর। হয়তো বিক্রি করবেন, আমিও এক বোতল নেওয়ার সুযোগ ছাড়িনি। মধুর গরম নিবারন করতে, হাটুজল সাংগুতে নেমে পড়ি রাত ৮টায়, চাঁদের অকৃপণ আলোর বর্ষণে প্রশান্ত শরীরে, রাজ্যের অধিপতির সুখ অনুভূত ছিলো, তন্দ্রা নিমেষে ইশারা করছিলো। দূরের কোনো সিংহাসন থেকে “রাজধনেশ” ডেকে ডেকে তার উপস্থিতির জানান দিচ্ছিলো। কিন্তু “এনোফিলিস” মশার ভয়ে আমি আমার সিংহাসন ছেড়ে রাতের ডেরায় ফিরলাম।

রাতের ভোজে নানান পাহাড়ি সবজি, মাছ, জুমের ভাত খেয়ে আরেক দফা আড্ডা মেরে, চোখ বন্ধ করে ভাবি, জীবন নেহায়েত মন্দ না,এখানে।

রুট:

ঢাকা থেকে বান্দরবানগামী বাসে উঠে পড়ুন। ভাড়া ৬৫০ টাকা। এবার বান্দরবান থেকে চান্দের গাড়িতে থানচি। ভাড়া (৭,০০০-৮,০০০) টাকা। থানচি পৌঁছে লোকাল গাইডের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে পুলিশ ক্যাম্পে নাম উঠিয়ে নেবেন। এবং অনুমতি পত্র দেখিয়ে সাংগু নদী অনুসরণ করে রুট প্লান তৈরি করে নিতে হবে। এই মুহুর্তে এই রুটটি সর্ব সাধারণের জন্য বন্ধ করা আছে। তবে সেনাবাহিনি ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ থেকে বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষে এই রূটে ভ্রমণ করতে পারবেন। 

সতর্কতা

যেখানেই যাবেন, যেভাবেই যাবেন, সতর্ক থাকবেন আপনার কোনো কাজে যেন প্রাকৃতিক পরিবেশের কোনো ক্ষতি না হয়। প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন জাতীয় দ্রব্য ব্যবহারের পর যেখানে সেখানে না ফেলা হয় সব এক করে পুড়িয়ে ফেলুন বা সাথে করে এনে নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলুন।

লেখক

তৌফিক তমাল। স্বপরিবারে কুমিল্লাতে অবস্থান করছেন। পড়াশোনা করেছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। লেখকের প্রধান আগ্রহের বিষয় পর্বতারোহন এবং এই বিষয়ে চর্চা করা। বিভিন্ন সময়ে ভ্রমণের পাশাপাশি লেখাটাও তার অন্যতম নেশা। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *