in

সহস্রধারা ঝর্ণা ও পাহাড় চড়ার স্কুল

গাড়ির মধ্যে চোখ বুজে বসে ছিলাম কুমিল্লা ছাড়ানোর পর। কতক্ষণ ছিলাম সেই হিসেব নেই। সাই সাই করে গাড়ি চলছে। চোখ খুলে বাম দিকে তাকাতেই দেখলাম কুয়াশা জমে আছে পাহাড়ের নিচে ফসলের জমিগুলোতে আর আকাশে আলো ফোটা শুরু হয়েছে। মীরসরাই এর এই জায়গাটা আমার খুব প্রিয়। প্রতিবার চট্টগ্রাম যাবার সময় এই ভোরের আলোয় পাহাড়ের আর কুয়াশার রূপ দেখতে বসে থাকি না ঘুমিয়ে।

যত দেরি হবে বলে ভাবছিলাম তত সময় লাগল না। কন্ডাকটর বললেন ব্যাগ গুছাতে, আর দুই মিনিট। দলের অনেকেই তখন ঘুমাচ্ছে। পাশের সিটে মাহি ভাইয়াও ঘুমাচ্ছেন বেঘোরে। ডেকে বললাম চলে আসছি। বিরক্তি ভরা চোখে একবার তাকিয়ে আড়মোড়া ভেঙে বললেন চলো, নামা যাক তাহলে।

শীতের ভোরে শীত  মিটিং। ছবিঃ নাদিয়া 

ভোর ৫টার মতো বাজে তখন। ভালোভাবে আলো ফোটেনি তখনো। মিরসরাইয়ের ছোট দারগার হাট নামে ছোট্ট একটা বাজারে নামলাম আমরা ১১ জন। অনেকেই সবে ঘুমিয়েছে বাসে। কাচা ঘুমের বিরক্তি অধিকাংশের চোখে-মুখে। রাস্তার পাশে একটা ছোট্ট খাবার হোটেলে ঢুকেই দেখলাম গরম গরম চা চলছে। ঢাকার তুলনায় বেশ ঠাণ্ডা এখানে তাই চায়ের লোভ সামলানো দায়।

গরম চা, নান রুটি আর ডাল খেতে খেতে গল্প শুরু হলো। দলের বাকি সদস্যদের কেউ চট্টগ্রাম আবার কেউ কুমিল্লা থেকে আসছেন। ভোর সাতটা পর্যন্ত অপেক্ষা করার কথা আমাদের। সবার সাথে পরিচিত হয়ে গল্পগুজব করতে করতে প্রায় ৮টা বাজল সকাল। তখনো দলের তিনজন সদস্য এসে পৌঁছায়নি।

যাত্রা শুরু। ছবিঃ লেখক 

আমরা অপেক্ষা না করে সিএনজি ভাড়া করে পাহাড়ের গহীনের দিকে রওনা হলাম। মাটি কেটে বানানো রাস্তায় চলেছি এদিক ওদিক দুলুনি খেতে খেতে। একদিকে গ্রাম আর অন্যদিকে পাহাড়ের সারি চোখে পড়ছে। ২০ মিনিটের মধ্যে আমরা চলে এলাম সহস্রধারা ড্যাম প্রকল্পের স্থাপনার কাছে। ঝর্ণা থেকে আসা পানি এই ড্যামে জমা রাখা হয়।

এখান থেকে নৌকা করে বা আবার মিনিট ২০ ট্রেকিং করে যাওয়া যায় ঝর্ণায়। যাবার পথে সবাই হেঁটে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। লেকের পাড় দিয়ে হাটছি। চারদিকে ২০০-৩০০ ফুট উঁচু ছোট ছোট পাহাড় আর তার মাঝেই লেকের পাশ দিয়ে ঝর্ণায় চলে গেছে ছোট্ট একটা ট্রেইল।

লেকের পাশ দিয়েই চলে গিয়েছে ট্রেইল। চবিঃ লেখক 

আমি সব সময় ট্রেকিংয়ে সবার আগে থাকতে পছন্দ করি। এর কোনো কারণ নেই যদিও। হাঁটতে হাঁটতে লেকের শুকনো একটা জায়গা ক্রস করেই ঝর্ণার শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম।এখানে সবার আগে এসে যে ভুল করেছি সেটা বুঝতে পারলাম ট্রেইল দেখে। দুই দিকে ট্রেইল চলে গেছে। একটা উপরে আরেকটা নিচে। নিচের দিকে নেমে একটু সামনে গিয়েই দেখি সামনে কোনো ট্রেইল নেই।

আবার পেছনের দিকে এসে উপরের দিকে হাঁটতে শুরু করতেই দেখলাম সেটা ঝর্ণার উপরের দিকে চলে গিয়েছে। বেশ ঝামেলায় পড়ে গেলাম পাহাড়ি ঝোপ ঝাড়ের মাঝে। কিছুক্ষণ দাঁড়ানোর পর দেখলাম দলের একজন নিচের দিয়ে যাচ্ছে। ৫ মিনিট পরেও ফিরে না আসায় সন্দেহ হচ্ছিল। আবার নিচে নেমে সামনে এগিয়ে দেখলাম ঝোপের নিচে দিয়ে সরু একটা জায়গার ভেতর দিয়ে বেশ খাড়াভাবেই ২০ ফুট নিচের দিকে ট্রেইলটি নেমে গিয়েছে।

লেকের শুনো জায়গার পাশেই আগাছার ট্রেইল। ছবিঃ তৌফিক তমাল 

দাঁড়িয়ে হাসি পাচ্ছিল। উনি না আসলে উপরের দিকেই চলে যেতাম। একটু পরেই দলের বাকি সবাই চলে আসল। নিচের দিকে নামতে শুরু করার পর দেখলাম মাহি ভাইয়া একজনের কোমরে রোপ বেধে নিচে নামাচ্ছেন।

অনেকেই এই খাড়া ঢাল দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছে। মাটির ঝুরঝুরে পথে হাতড়ে পাচড়ে কোনোমতে নেমে আসলাম ঝর্ণার সামনে একটা শুকনো জায়গায়। ঝর্ণার পানি ১,০১০ ফিট উপর থেকে আছড়ে পড়ছে পাথরের গায়ে। একটু ঝোপের মধ্যে দিয়ে হেঁটে পাহাড় বেয়ে একটু পরে উঠে বসে থাকলাম বাকিরা আসার অপেক্ষায়।

পাহাড়ে চড়ার ক্লাস চলছে। ছবিঃ লেখক 

সবাই চলে আসলে শুরু হলো ক্লাসের প্রথম পর্ব। শান্ত হয়ে বসে সবাই পরিচিত হলাম ইকুইপমেন্টগুলোর সাথে। রোপ, হার্নেস, ক্যারাবিনার, পুলি, ফিগার অফ এইড, বিলে ডিভাইস, জুমার, রিভারসিনো ছাড়াও বেশ কিছু পর্বত আরোহন উপযোগী নট শেখানো হলো। ভালোমতো সবাই মন দিয়েই ক্লাসটি শেষ করে এবারের পালা ঝর্ণার উপর দড়ি স্থাপন করা।

এই ব্যাপারটি বেশ মজার হবে ভেবেই ৬ জনের একটি দলের সাথে আমিও রওনা হয়ে গেলাম। ট্রেইল হারিয়ে আমরা অফ ট্রেইলে উঠছিলাম। কখনো চিকন বাঁশের ঝোপ, কাটার ঝোপ আর গাছ-গাছালির ভেতর দিয়ে উপরের দিকে উঠছি। কিছু কিছু জায়গায় কাটা লেগে ছিলে গিয়েছে বুঝতে পারলাম। হাত কেটে গিয়েছে কয়েক জায়গায় তবুও তীব্র একটা উন্মাদনা কাজ করছে বুকের ভেতর।

নিচে রোপ ফেলার পর চলছে বিলেয়িং এর কৌশল। ছবিঃ লেখক 

প্রায় আধা ঘণ্টা ঝোপের সাথে যুদ্ধ করে আমরা ট্রেইলের দেখা পেলাম। ট্রেইল ধরে আসলে এত কষ্ট করতে হতো না। এরপর পাহাড়ের মাথা থেকে নিচের দিকে ঝর্ণার মুখে আসলাম। ছোট্ট একটা ঝিরি দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে ১১০ ফিট নিচে। উপরে পুলি করা শিখে নিয়ে রোপ ফেলে দিলাম নিচে।

বেশ খানিকটা পেছনে সতর্কতার সাথে বসে আছি। খুব পিচ্ছিল আর পাথুরে এই ঝিরির পথটি। ১০ মিটার দূরে থেকেও পা পিছলালে একবারে ১১০ ফিট নিচে আছড়ে পড়া ছাড়া উপায় নেই, যা প্রায় ১১ তলা বিল্ডিংয়ের সমান উঁচু। এবার এটা বেয়ে নিচে নামার তোড় জোড় শুরু হয়ে গেলো।

রুট ও খরচের খসড়া:

ঢাকা থেকে বাসে বা ট্রেনে করে চলে আসতে হবে চট্টগ্রামের মীরসরাই এই ছোট দারগার হাট। ট্রেনে আসলে সীতাকুণ্ড স্টেশনে নেমে চলে আসতে হবে এখানে। এখান থেকে ৫০ টাকার ভেতর নাস্তা হয়ে যাবে। দরকারী সরঞ্জাম নিয়ে রিজার্ভ সি.এন.জি ভাড়া পড়বে ১২০ টাকা। সি.এন.জি নামিয়ে দিলে সেখান থেকে হেঁটে বা জন প্রতি ৪০ টাকা নৌকা ভাড়া দিয়ে সোজা চলে আসা যাবে সহস্রধারা ঝর্ণায়।  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *