in

সাংগুর সভ্যতায় প্রবেশ ও ভিন্ন এক জীবনকাব্য

লাগপাই পাড়া থেকে সাংগুর আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়, তারপর তার পিছু নিয়ে চললাম, তাংখোই পাড়ার দিকে। ১ ঘণ্টার হাঁটাপথ, সাংগু এখানে ১০-১২ ফিট চওড়া হবে, কোথাও গোড়ালি অবধি জল ওঠে না, কোথাও একটু বেশী। পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে চলছে মন্থর গতিতে শান্ত-মোহনীয়া শংখ মাতা। তাংখোই পাড়ার রূপও কোনো অংশে কম না,পাহাড়ের উপরে পাড়ার অবস্থান, একপাশে ফসলি জুমের পাহাড় আরেক পাশে প্রাগৈতিহাসিক সব গাছের সমারোহ।

সাংগু রিজার্ভ ফরেস্ট, সাংগু নদীর একটি সহায়ক জলধারা. ছবিঃ তৌফিক তমাল

কিন্তু এই ফসলি জুমের জন্য কত যে দুর্লভ উদ্ভিদ ও প্রানীকুলের আত্মাহুতি দিতে হয় ,তা স্বচোখে দেখে প্রতিবার জুমের মৌসুমে পাহাড়ে যেতে অস্বস্তি বোধ হয় কিঞ্চিৎ। এই পাড়ায় কাঁচা আমের সাথে পাহাড়ি মরিচের এক মহাভোজ চিরস্মরণীয়, কারণ পরবর্তী দু’দিন পেট আর পায়ুপথ আগ্নেয়গিরিতে রুপান্তরিত হয়েছিল।

মানুষগুলো বাঙালি দেখে অভ্যস্ত নয়, তাদের কাছে বাঙালি বলতে সীমান্তরক্ষীরাই,আর হাতে গোনা কিঞ্চিৎ বাঙালি তারা প্রত্যক্ষ করেছেন। ফসলি জুমে সাংগুর জল, ভাতের পাতে সাংগুর মাছ, লাউ দিয়ে বানানো পানির পাত্রে সাংগুর সুপেয় জল, সাংগুই সর্বেসর্বা।পাড়াটিতে একজন কবিরাজ আছেন, যাকে দেখলাম জ্বরের জন্য চিকিৎসা দিচ্ছেন, অন্ধকার এক ভুতুড়ে আবহে, পাহাড়ি জড়িবুটি আর মন্ত্র-তন্ত্রের মিশ্রণে রোগীর আরোগ্য লাভের প্রার্থনা।

সাংগু পাড়ের গ্রাম,তাংখোই পাড়া। ছবিঃ তৌফিক তমাল

আমরা পাড়ায় পাড়ায় বিশ্রাম নিয়ে থাকি, সাংগু প্রাণ সঞ্চার করে চলছেই বিরামহীনভাবে। পিছু পিছু পানঝিরি পাড়া অবদি আরেকটু বিশ্রাম। পানঝিরি পাড়াটি পানছড়া নামক ঝিরির নামে যেমনটা লাগপাই পাড়ার নাম। যা শংখের একটি উল্লেখযোগ্য যোগানদাতাও বটে। মোটামুটি সমতলে পাড়াটির অবস্থান, চারপাশে পাহাড় ঘেরা।পাড়াটিতে ঢুকেই মন খারাপ হবার যোগাড়, অসংখ্য গাছে আগুন জ্বলছে, জমি বানিয়ে জুমের উপযোগী করতে, কিন্তু এটাই তাদের ধারাবাহিক জীবিকা পদ্ধতি।

জনসংখ্যা বাড়ছে পাহাড়েও, কিন্তু বাড়ছে না ফসলি জমি, খাবার খাওয়া মুখগুলো বাড়ছে অনিয়ন্ত্রিতভাবে কিন্তু খাবার যোগানদানকারী পাহাড় আর তার কন্যা “সাংগু” কিন্তু সেই স্থিরই রয়েছে। এটিও একটি ম্রো পাড়া। বর্ষায় পানঝিরি পাড়া এবং লাগপাইপাড়া অবদি বোট যায়, তখন দুর্গমে থাকা মানুষগুলোর যাতায়াত থানচির সাথে সহজ হয় কিঞ্চিৎ, কিন্তু তাও ব্যয়বহুল নৌযাত্রা।

লিক্রি পাড়া। ছবিঃ তৌফিক তমাল

পানঝিরি পাড়ার একটু পর থেকে সাংগু সহজ পথ ছেড়ে বন্ধুর পথে অগ্রসর, ১০-১২ কিলোমিটার যেতে যেতে সে লিক্রির দিকে চলছে। এই পথে দেখা মিললো, নানান সব জীববৈচিত্রের। একটি জংগল, একটি নদীর পরতে পরতে এতটা বিস্ময় থাকে,তা স্বচক্ষে দেখবার মতো সৌভাগ্য থাকতেই হয়। ভর দুপুরে সাংগু রিজার্ভ ফরেস্টে আলোস্বল্পতা থাকে, গা ছমছমে আবহ, প্রানীদের চাঞ্চল্য, জনমানুষ শুন্যতা, ঝিঁঝিঁ পোকাদের বিরামহীন সংগীত, রাজ ধনেশের হুংকার, হাতির পায়ের ছাপ, পাখিদের কিচিরমিচির, বানরদের ছুটোছুটি সাথে পথিকের অজানা সব ভয়।

সব মিলিয়ে এক রোমাঞ্চকর যাত্রা। দুর্গম পথ, বিপদবহুল গিরি সংকটে সকল প্রাণে প্রাণের সঞ্চার করে এই শংখ মাতা। জীবিকার সুযোগ দেয়, তার নামে স্থির হওয়া সংরক্ষিত বনে। সকলকেই- হোক সে দেশি, আদিবাসী কিংবা ভিনদেশী। যদিও অই অঞ্চলে শংখের হাল সরু নালা কিংবা ঝিরির মতো। লাগপাই পাড়া থেকে শংখ তার যাত্রা শুরুর পর তাংখোই পাড়া হয়ে পানঝিরিতে আরেকটু শক্তিশালি হয়ে রিজার্ভ ফরেস্টের ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে আরো কিছু ঝিরির সহায়তায় কিঞ্চিৎ স্রোতস্বিনী। ঠিক যেন কৈশোরে পদার্পণ করেছে সে।

বহমান সাংগু কাব্য। ছবিঃ তৌফিক তমাল

সাংগু চলছে তার গতিতে, লিক্রি পাড়ায় এসে সে তার জলধারা বাড়াতে লিক্রি ঝিরির সাথে মিলিত হয়। দু’দিন আগে এসেছিলাম পাড়াটিতে, আজ ফিরতি পথে সাংগুর সাথে আবারো, তবে এ যাত্রায় রাত হয়ে গেলো। লিক্রি পাড়াটি দুটি অংশে বিভক্ত- একটি ত্রিপুরা পাড়া, অন্যটি মুরং পাড়া। তবে ২/৩টি তঞ্চংগ্যা পরিবারও থাকে। লিক্রিপাড়ার গোধূলি জীবনের অন্যতম অপার্থিব স্মৃতি। এখানকার মানুষদের আতিথেয়তা মন থেকে উৎসরিত।

এখানে শংখ একটু গভীর, ভাবতেই অবাক লাগল শুরুর দিকটায় গোড়ালী বা হাঁটু অবদি পানি ছিল না, আর এখানে আজ ডুব সাঁতার দেওয়া যাচ্ছে। রাত নামলো লিক্রি পাড়ায়, আপাতত আজকের আবাস এখানেই, সকালে খাওয়ার পর সারাদিন ট্রেকিং শেষে, এবার রান্নার পালা। এক দাদার বাসায় উঠেছিলাম, যেটা পাড়ার একেবারে শেষের দিকে।

শংখ আন্ধারমানিক এলাকা। ছবিঃ তৌফিক তমাল

টানা ৯ দিনের বিরামহীন ট্রেকিংয়ের শেষদিন আজ। ব্যাগভর্তি খাবারের ওজন কমানোর সুযোগ আজ, সাথে ভালোমন্দ খাওয়ার পালা, একটি মুরগী কিনে কাটাকাটির পর রান্নায় বসিয়ে দিলাম। তারপর খিচুড়ি মিক্স, রান্না শেষে দাদা-দিদি তাদের ২ সন্তান সমেত খেতে বসলাম। দিদি মারফা এনে দিলেন, যা দিয়ে সালাটুকুও হয়ে গেল। খাওয়া-দাওয়ার পর অবশিষ্ট মুরগী দিদিদের জন্য রেখে গেলাম, দিদিও আতিথেয়তায় কমতি রাখেননি, জুম থেকে আনা সবজি আর নাপ্পি মেশানো মাছের তরকারী দিলেন। উদরপূর্তির পর চায়ের চুমুকে আড্ডায় মশগুল আমরা, আড্ডায় সামিল হলেন পাশের ঘর থেকে আসা দাদারাও।

তাদের অনুরোধ করলাম, যেন একটা বোট ঠিক করে দেন, যা দিয়ে সাংগুর বাকিপথটুকু উজান থেকে ভাটির দিকে যাওয়া যায় থানচি অবদি। অনেক কাঠখড় পেরিয়ে দাদা একটি বোট ম্যানেজ করলেন, শুষ্ক মৌসুম বোট চলাচল তেমন একটা হয়ই না। পাড়ায় সবচেয়ে স্বচ্ছল যিনি, তার একটি বোট আছে।

আন্ধার মানিক পাড়া। ছবিঃ তৌফিক তমাল

পরদিন রওনার সময় ঠিক করে আড্ডা যথারীতি চলছে, এক পর্যায় দাদারা পাহাড়ি পানীয় ও জড়িবুটির মিশ্রণে এক ধূমপান জাতীয় কিছু একটা বানালেন, আর টানে টানে উনাদের হাস্য রসাত্মক জীবন কথার বর্ণনা দিচ্ছিলেন। জিজ্ঞেস করলাম, দাদারা এগুলা কী? বললেন, এনার্জি, ওষুধ।

এর কাজ কী দাদা?

বললেন, তোমরা যে সারাদিন পাহাড়ে হাঁটো, একটু খাও কাজে লাগবে, আমরা এর দ্বারা শক্তি পাই, ম্যালেরিয়া কম হয়। কোনোরকম এড়িয়ে গেলাম, সাথে থাকা স্ন্যাক্সগুলোও উনাদের দিলাম। খুব খুশিও হলেন, বললেন আবার এসো বর্ষায় ঝর্ণা আছে অনেকগুলো দেখাবো। এরপরে  বললেন, “মাইনুলকে চেনো? তোমাদের মতো পাহাড়ে ঘোরে। আমার বন্ধু, কয়েকবার এসেছে এখানে।” বাহ, বেশ ভালো লাগলো মাইনুল ভাইয়ের নাম শুনে।

শিকার ও পাহাড়ি  জীবন।  ছবিঃ তৌফিক তমাল

আড্ডা মধ্যরাত অবদি চললো, দুটো মশার কয়েল জ্বালালাম, কিন্তু মশার তান্ডব থামার কোনো নামই নেই। বুঝলাম কেন এটি তীব্র ম্যালেরিয়া প্রবণ এলাকা, যার বাসায় ছিলাম তার বাবাও গতবছর ম্যালেরিয়াতে মারা গেছে, আর কঠিন রোগ বলতে এখানে ম্যালেরিয়াই প্রধান। সকালে আজ একটু দেরি করেই উঠলাম, গন্তব্য আন্ধারমানিক পাড়া। বোটম্যান ও তার ২ সহযোগী হাজির, হালকা নাস্তা শেষে সাংগুকে অনুসরণ করে উঠে পড়লাম বোটে।

কিশোরী সাংগু এখনো নৌ চলাচলের জন্য প্রস্তুত না, তার আরও জল চাই। নিস্তব্ধ পরিবেশে বার্মিজ ইঞ্জিনবোট শব্দ দূষণ ঘটিয়ে কয়েক ফুট আগায়, আবার থেমে যায়।এক পর্যায় দ্বিধা হচ্ছে, বোট আমাদের সাংগুতে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে, না আমরা বোটকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছি। ঘণ্টা দুয়েক সাংগুর বুকে বোটের হার না মানা যুদ্ধ শেষে নাম না জানা এক পাড়ায় তেল নিতে থামলেন। আর বলে গেলেন, ক্যামেরা যেন বের না করি, এ পাশটা অনেকের চলাচলের রাস্তা। বাকিটা বুঝে গেছি, তাই বোট থেকে নামবার সাহস পাইনি।

আন্ধার মানিক পাড়া।  ছবিঃ তৌফিক তমাল 

ইঞ্জিনবোটের উদরপূর্তির পর সাংগুর বুকে আবারো যাত্রা শুরু। এই পাড়ায় শংখ যখন মোটামুটি স্রোতবহা সে চলতে থাকে তার যাত্রাপথে, বাঁকে বাঁকে বসতি গড়ে পাথুরে সে জীবন দায়িনী স্রোতস্বিনী চলছে, মাঝে সে একটু প্রশস্ত, মাঝে সরু। কখনো অরণ্য ভেদ করে সে ছুটছে, কখনো পাহাড়ের গা ঘেঁষে। তীরে তীরে গড়ে তুলছে সভ্যতা, নিজেও সভ্য জগতের পানে ছুটছে।

বেলা গড়িয়ে পড়ছিল, সূর্য মামা উপর থেকে আগুন ফেলছিলেন, পরিত্রাণ মিললো বিশাল সব গাছের ছায়ায় ঘেরা সাংগুর শীতলতায়। এখানে সে ধীরে ধীরে যৌবন পাচ্ছে, জলের রঙ সবুজাভ স্বচ্ছ। দূরে একটা বাঁশের ভেলায় ৩ জন লোক। যার মধ্যে একজন শুয়েছিল ভেলায়, আর ২ জন দাঁড় বাইছিল। আমাদের বোট তাদের ওভারটেক করে যায়, দেখলাম জীবন সেখানে কতটাই সংগ্রামের। বৃদ্ধ লোকটি অসুস্থ, ভালো চিকিৎসার জন্য তাকে হয়তো দূর কোনো পাড়ায় নিয়ে যাচ্ছে তার প্রিয়জন।

আস্তে আস্তে সাংগু যেন রিজার্ভ ফরেস্টে প্রবেশ করে ফেলেছে আবার, তবে এবার প্রকৃত রূপে নদী হয়ে।

লেখকঃ 

তৌফিক তমাল। সপরিবারে কুমিল্লাতে অবস্থান করছেন। পড়াশোনা করেছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। লেখকের প্রধান আগ্রহের বিষয় পর্বতারোহন এবং এই বিষয়ে চর্চা করা। বিভিন্ন সময়ে ভ্রমণের পাশাপাশি লেখাটাও তার অন্যতম নেশা। 


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *