in

সীতকুণ্ডের অনিন্দ্য সুন্দর ঝরঝরি ট্রেইল

চট্টগ্রামের মিরসরাই-সীতাকুণ্ড মিলে বারৈয়াঢালা জাতীয় উদ্যান। প্রায় তিন হাজার হেক্টরের এ বনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অনেকগুলো ঝর্ণা আর সুন্দর সুন্দর সব ট্রেইল। সবসময় আমার ইচ্ছা হতো এ ট্রেইলগুলো ঘুরে দেখার, কিন্তু কী কারণে জানি কিছুতেই সময় সুযোগ মিলতো না। অপ্রত্যাশিত সুযোগটা একদিন পেয়ে গেলাম।

ইকো ট্যুুরিজম গ্রুপের অপু নজরুলকে দেখতাম প্রায়ই এ ঝর্ণা সে ঝর্ণায় যাচ্ছে। এবার মিলেই গেল, ওর ঝরঝরি ট্রেইলে যাওয়ার ঘোষণা দেখে আমিও প্রস্তুত হয়ে গেলাম যাওয়ার জন্য। চট্টগ্রাম থেকে সকালে রওনা দিলাম সীতাকুণ্ডের উদ্দেশ্যে। চয়েস বলে একটা গাড়ী ছাড়ে একে খান মোড় থেকে, মোটামুটি কোথাও থামে না। চট্টগ্রাম থেকে যারা যোগ দেবে তাদের সাথে এ গাড়ীতে উঠে রওনা হলাম আমরা।

ট্রেইলের শুরু ছবি লেখক

সীতাকুণ্ডের পন্থিছিলা বাজারে নেমে পড়লাম বাস থেকে, সময় লেগেছে এক ঘণ্টার একটু বেশি। বাজারে নেমে জানতে পারলাম দলের বাকি সদস্যরা যারা ঢাকা থেকে রওনা দিয়েছেন এখনও এসে পৌছাতে পারেননি। তাই এ সময়ে নাস্তা করে নিলাম আমরা। বাকিরা এসে পৌঁছানোর পর বাজার থেকে শুকনো খাবার নিয়ে রওনা হয়ে গেলাম। রেল লাইন পেরিয়ে কিছু ফসলের জমির মধ্য দিয়ে হেঁটে একসময় ট্রেইলে নেমে পড়লাম।

গতরাতে ভালোই বৃষ্টি হয়েছিল, তাই ট্রেইলে পানি দেখা যাচ্ছে অনেক। আমরা অবশ্য বৃৃষ্টির ও পানির প্রস্তুতি নিয়েই এসেছি। ছবি তোলার জন্য ব্যবহার করছি ওয়াটারপ্রুফ কেইস লাগানো একশন ক্যাম। ওশেন ব্যাগে নিয়েছি বাকি সবকিছু, ফলে ভিজে মূল্যবান কিছু নষ্ট হবার কোনো সম্ভাবনা নেই। ট্রেইল ধরে পায়ের গোড়ালি সমান পানিতে হাঁটার আনন্দই আলাদা।

কিছুক্ষণের মধ্যে যেন মানব সভ্যতাকে পেছনে ফেলে আসলাম। নেই কোনো কোলাহল, যান্ত্রিক জীবনের শব্দ, আছে নীরবতা, পাখির গান, পানি প্রবাহের শব্দ। অপু নেতৃত্ব দিচ্ছে সামনে থেকে। এ পথে সে এত চলেছে নিজের বাড়ির আঙ্গিনার মতোই চেনে সে। ছোট দল নিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি পাহাড়ের দিকে।

পানি ছেড়ে আমাদের পথচলা শুরু হলো পাহাড়ি ট্রেইলে। তেমন কঠিন কোনো ট্রেইল না, দেখতে দেখতে উঠে আসলাম পাহাড়ের উপরে। এখান থেকে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের অংশ বিশেষও দেখা যাচ্ছে। হাতের জিপিএস জানাচ্ছে এ পাহাড়ের উচ্চতা এক হাজার ফুটের একটু বেশি। এবার পাহাড় থেকে নামার পালা।

পাহাড়ের উপর থেকে সীতাকুন্ড ছবি লেখক

আধা ঘণ্টা হেঁটে আমরা একটা ছোট পাহাড়ি ছড়ার কাছে পৌঁছে গেলাম, জায়গাটা একটা ছোট পুকুরের মতো তৈরী করেছে। এখানকার লোকজন এ ধরনের পানির ছড়ায় তৈরী পুকুরকে বলে কুম। সাথে সাথে পুরো দল ঝাপিয়ে পড়লো পানিতে। অনেকক্ষণ পানিতে গোসল করে সতেজ হয়ে আবার শুরু করলাম পথচলা। এবার পথ খুঁজে পেতে অনেক কষ্ট হলো, বনের মধ্যে যেখানে বাঁক নেবার কথা সে জায়গাটা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।

কুম পেয়ে শান্তি ছবি লেখক

উপর থেকে ছোট্ট একটি ঝর্ণা নিচে পড়ে একটা কুম সৃষ্টি করেছে। সেখানে একটা বড় পাথরের উপর থেকে নিচের কুমের দৃশ্যটা দেখে থমকে যেতে হলো। অদ্ভূত সুন্দর পানির রং, নীলাভ সবুজ। কতক্ষণ সে পানির দিকে তাকিয়ে থাকলাম জানি না, ঝর্ণা বেয়ে নামাটা মারত্মক ঝুকিপূর্ণ হবে বলে অন্য পথ ধরতে হলো।

পুরো ট্রিপের ভিডিও: source: www.youtube.com/pothik

নিচে নামার পথটা আপাত দৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও নামতে গিয়ে ‍বুঝলাম কতটা খাড়া। রীতিমতো এক গাছ থেকে অন্য গাছে সাবধানে হাত দিয়ে ধরে নিচে নামতো হলো। অবশেষে একে একে সবাই যখন নিরাপদে পাহাড় থেকে নেমে আসতে পারলাম তখন আবারও একটা পানিসহ ট্রেইলে পড়লাম। এবারের ট্রেইলটা বেশ পাথুরে, পানির পরিমাণও বেশি এবং দেখতে আরও সুন্দর।

গরম থেকে মুক্তি দিল ঝর্ণার ঠান্ডা পানি ছবি রানা

একটা জায়গায় দুপাশে পাথুরে পাহাড় আর মাঝে দিয়ে যাওয়ার পথটায় মোটামুটি ৩-৪ ফিট পানি ছিল, এখানে এসে সবাই এত মুগ্ধ হয়ে গেল ছবি তোলা আর শেষ হচ্ছিল না। এরপর পাথুরে ঢালের মধ্য দিয়ে আমরা ছোট ঝর্ণায় পৌঁছালাম। কুম অবশ্য এখান থেকে বেশি সুন্দর লাগছে না, উপর থেকেই বেশি সুন্দর লাগছিল।

ট্রেইলটা এখানেই বেশি সুন্দর ছবি লেখক

যারা সাঁতার জানি, তারা সবাই ঝর্ণায় নেমে পড়লাম। বাকিরা তীরে বসে রইলো। ঝর্ণা বেয়ে একটু উঠে অনেকক্ষণ ঝর্ণায় ভিজলাম। এপ্রিলের এ গরমে ঝর্ণা যেন আমাদের সব ক্লান্তি মুছে দিল আমাদের। সারাদিন এখানে পড়ে থাকলে তো হবে না, এখনই দুপুর হয়ে গেছে, তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফিরতি পথ ধরলাম। পাথুরে ট্রেইল ধরে এবার আমাদের লক্ষ্য ঝরঝরি ঝর্ণায় পৌঁছানো।

এ জায়গাটার কথা সবসময় থাকবে ছবি লেখক

নামার সময় বোঝা গেল বিষয়টা মোটেও সহজ নয়। বিশেষ করে এক জায়গায় বড় বড় বোল্ডারের ভেতর দিয়ে পানির স্রোতের মধ্য দিয়ে নামতে বেশ বেগ পেতে হলো। দলের দক্ষ ট্রেকাররা বাকিদের সাহায্য করে নামিয়ে নিয়ে আসে। এক সময় একটা জায়গায় পৌঁছায় যেখানে ছোট একটা খালের মতো। পানি কম, কিন্তু তলদেশটা পিচ্ছিল আর পাথুরে। কমবেশি সবাই সেখানে আছাড় খেতে খেতে এগিয়ে গেলাম আমরা।

প্রকৃতির সিঁড়ি ছবি লেখক

এরপর আসলো একটা পাথুরে স্লাইড। শ্যাওলা জমে পিচ্ছিল হয়ে এমন হয়ে আছে জায়গাটা সেখানে গিয়ে বসলেই মুহূর্তেই নিচের জমে থাকা পানিতে পড়া যাচ্ছে। দলের সদস্যরা এবার সব ছোট বাচ্চা হয়ে গেল, এ স্লাইডে চট্টগ্রামের ভাষায় “ছচ্চরি” মানে পিছলে নেমে যেতে থাকলো। আর কিছুদূর গিয়েই খুঁজে পেলাম রূপসী ঝরঝরি ঝর্ণাটাকে, বিশাল জায়গা জুড়ে ঝরে পড়েছে।

ঝরঝরি ঝর্ণায় অবগাহন ছবি লেখক

নামকরণের সার্থকতা ঝর্ণা দেখলেই বোঝা যায়, বেশ প্রশস্ত কিন্তু বেশি উঁচু না। ঝর ঝর করে পড়ছে পানি, ধন্যবাদ দিতে হয় গতরাতের বৃষ্টিকে। এ সময় পানি নাও পেতে পারতাম আমরা। সদলবলে ঝর্ণায় ভিজতে থাকলাম। মজার ব্যপার হলো পুরো ট্রেইলে আমরা ছাড়া অন্য কাউকে দেখতে পাইনি।

মূল্যও দিতে হয়েছে কিছু, জোঁকের কামড়ে এ হাল ছবি লেখক

দুপুর গড়িয়ে এখন বিকাল, আমাদের ফিরে যাবার সময় হয়েছে। সারাদিনের এই অ্যাডভেঞ্চার শেষ করে আমরা ফিরতে শুরু করলাম। ঝরঝরি ঝর্ণা থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক আসলে বেশি দূরে না, তাই অল্প সময়ের মধ্যেই দ্রুত পা চালিয়ে আমরা ফিরে আসলাম পন্থিছিলা বাজারে। সেখান থেকে একটা লেগুনা রিজার্ভ নিয়ে ফিরে আসলাম চট্টগ্রামে।

এ ধরনের জায়গায় যারা যাবেন, তারা অবশ্যই মনে রাখবেন এ জায়গাগুলোর কোনো ক্ষতি যাতে আপনাদের দ্বারা না হয়। বেশি বড় গ্রুপ নিয়ে যাবেন না, অপচনশীল কোনো কিছু ফেলে রেখে আসবেন না। আমরা আমাদের ভ্রমণের সময় এটা কঠিনভাবে পালন করি, দায়িত্বশীল পর্যটনকে উৎসাহিত করি।

কীভাবে যাবেন:

ঢাকা/চট্টগ্রাম থেকে সীতাকুণ্ডের পন্থিছিলা বাজারে নেমে বাজার থেকে কোনো গাইড নিয়ে যেতে পারেন।

ফিচার ছবি- লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *