in

স্পিতি ভ্যালির প্রথম গ্রাম লোসারের গল্প

ছাত্রু ছাড়ানোর পর গাড়ি বেশ কিছুক্ষণ অফ ট্রেইলেই চলছিলো। বাজেভাবে দুলুনির সাথে চন্দ্রার প্লাবিত রাস্তাঘাট রীতিমতো ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করেছে। কুঞ্জম পাসে ওঠার সময় দেখলাম হাজার হাজার মিটার রাস্তা কাদায় ভরে গিয়েছে। দক্ষ ড্রাইভার আংরুফ বেশ ভালোভাবে আর ভালো গতিতে উপরের দিকে উঠতে শুরু করেছে। কুঞ্জম পাস প্রায় ৪,৫০০ মিটার উঁচু।

ভালোভাবেই কুঞ্জম পাসের উপর গিয়ে গাড়ি থামল। চারদিকে মেঘে ছেঁয়ে আছে। রাস্তার উপর এভাবে হোয়াইট আউট হয়ে যাব তাও স্পিতির ভেতর একথা স্বপ্নেও ভাবিনি আগে। কিন্তু কী আর করার, তীব্র বাতাসের সাথে রাস্তার সামনে ২০ ফুটের বেশী দেখা যাচ্ছিলো না। কুঞ্জম পাস যখন ছাড়ালাম তখন মেঘ একটু কমে এসেছে। কারণ গাড়ি নিচের দিকে স্পিতি রিভারের বেডে নামতে শুরু করেছে।

লাহুল এলাকায় চন্দ্র নদীর প্লাবন। ছবিঃ লেখক 

স্পিতি রিভারের পাশ দিয়ে সাই সাই করে গাড়ি চলছে। এখানের রাস্তার অবস্থা একটু ভালো। পাথুরে রাস্তা ছাড়িয়ে এসেছি ততক্ষণে। স্পিতি ভ্যালির একটা গ্রামও তখনো চোখে পড়েনি। প্রাচীন এই গ্রামগুলো দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে বসে আছি কয়েক ঘন্টা যাবৎ।

সামনে থেকে মেঘ সরে যেতেই দেখলাম রাস্তার উপর বিশাল সাইনবোর্ডে লেখা  ওয়েলকাম টু স্পিতি ভ্যালী। মানালি থেকে গাড়ি ছাড়ার আট ঘণ্টা পর আমরা এসে পৌঁছলাম স্পিতি ভ্যালির প্রথম গ্রাম, লোসারে। এখান থেকে বিদেশীদের পাসপোর্ট চেক করা হয়।

লোসার ঢোকার জন্য স্বাগতম। 

এই ফাঁকে দেখতে গেলাম টিউলিপ, ঘাসফুল, সরষে ফুলের গ্রামটিকে। চারপাশে তাকালে ধূসর পাহাড় আর গাঢ় নীল আকাশের মাঝে ছোট্ট ছবির মতো সাজানো এই গ্রাম দেখলে মুগ্ধ হয়ে যাবে দুনিয়ার যে কেউ। লোসারে যখন গাড়ি থামল তখন আমাদের সামনের গাড়িতে দেখলাম চেকিংয়ের সমস্যা চলছে। আংরুভ ভাই বললেন এক ঘণ্টা সময় পাওয়া যাবে, লোসার ঘুরে দেখতে পারেন কেউ ইচ্ছে হলে। এই সুযোগ কে-ই বা ছাড়তে চায়! 

গ্রামে ঢোকার পথে প্রথমেই চোখে পড়বে চেকিং অফিস। এখানে প্রত্যেক বিদেশীর পাসপোর্ট চেকিং হয়। স্পিতিতে কবে ঢুকছেন ও কবে বের হচ্ছেন তার একটা লিখিত তথ্য জমা রাখা হয় এখানে। সামনে এগোলেই দেখলাম বিশাল ধু ধু পর্বতরাজীর মধ্যে ছোট্ট একটা সবুজ আর সাদা রঙের গ্রাম।

ফুলেল লোসারে জবুথবু অবস্থায় আমি। 

চারদিকে ফুটে আছে নানা জাতের ফুল আর তার মধ্যেই করা হয় ডালের চাষ। মসুরি ডালের চাহিদা এখানে বেশ বেশী মনে হলো আমার কাছে। ধূসর রঙের পাহাড় আর নিরেট নীল রঙের আকাশের মধ্যে এই সবুজ গালিচা যেন স্বর্গ নেমে আসার মতো ব্যাপার। মাঠ ছাড়িয়ে যখন গ্রামে ঢুকেছি তখন বেশ গুড়ি বৃষ্টি শুরু হলো। প্রথমেই গ্রামের কিছু ছবি তুলে নিলাম। এরপর পরিচিত হলাম কিছু স্থানীয়দের সাথে। 

স্পিতি ভ্যালির অধিকাংশ মানুষ তিব্বতীয়। এরা বহুকাল আগে থেকেই এইসব এলাকায় বসতি স্থাপন করে থেকে গেছেন এই এলাকায় যা এক সময় প্রচণ্ড রকমের দুর্গম ছিল। কোনো যাতায়াত ব্যবস্থা ছিল না বললেই চলে। কোনো কিছু দরকার পড়লে ভারতের শহরগুলোতে এখানকার স্থানীয়া হেঁটে আসতেন সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে। 

গ্রামের ঘরবাড়ি গুলো। ছবিঃ লেখক 

লোসারে সব মিলিয়ে ৫০-৬০টা ঘর চোখে পড়ল। এর বেশ খানিকটা উপরে পাহাড়ের ঢাল ধরে উঠে গেলে চোখে পড়ল একটা মনিস্ট্রি। এত উপরে গিয়ে ফিরে আসতে অনেক সময়ের দরকার। তাই আর উপরের দিকে গেলাম না। আনুমানিক ২০০ লোকের বাস এই গ্রামে। তার কম হবার সম্ভাবনাই বেশী মনে হলো। 

স্পিতি ভ্যালি মূলত রেইন শেইডেড এলাকা। অর্থাৎ এখানে বৃষ্টিপাত হয় না বললেই চলে। তাই এই এলাকাকে শীতল মরুভূমিও বলা হয়ে থাকে। কিন্তু জলাবায়ু পরিবর্তনের ফলে সেই পরিস্থিতি এখন ভিন্ন। এখানকার ঘরবাড়িগুলো মূলত মাটি, পাথর আর চুন সুরকির প্রলেপ দিয়ে তৈরি করা হতো প্রচণ্ড শীত ও বরফপাত থেকে নিজেদের রক্ষার জন্য। 

দুর্গম হলেও কিছু অংশে নেটোয়ার্ক ও আছে। ছবিঃ লেখক 

কিন্তু বৃষ্টিপাতের ফলে তাদের জীবনযাপন যে ব্যাহত হচ্ছে তা বেশ ভালোভাবেই বোঝা যাচ্ছে। অধিকাংশ পুরুষেরা গ্রামেই আছেন, অর্থাৎ কাজে যেতে পারেননি। ওদিকে পাহাড়ের উপর থেকে ভেসে আসছে পুজো অর্চনার শব্দ। আকাশের কোথাও কোথাও মেঘের গর্জনের শব্দ, হাজার হাজার পর্বতে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসছে এই গ্রামে। যেন কোনো স্বর্গের কোনো দেবালয়ে আশ্রয় নিয়েছি বলে মনে হচ্ছে। 

এখানকার মানুষগুলো খুবই সরল প্রকৃতির। ছোট্ট এই গ্রামে একটি-দুটি স্কুল খেয়াল করলাম যেগুলোতে ভারতের অন্যান্য জায়গা থেকে আসা শিক্ষকরা পাঠদান করে থাকেন। হিন্দি ভাষার পাশাপাশি চলে স্পিতিয়ান ভাষা৷ যার মাথা মুণ্ডু কিছুই বোঝার ক্ষমতা নেই আমার। 

লোসারের বাজার। ছবিঃ লেখক 

স্থানীয়দের মধ্যে অনেকেই শুনতে চাইলেন আমি কোথা থেকে আসছি।  আমার সহযাত্রি মার্গারেট ছিলেন ইতালিয়ান। উনিও বেশ কথা বললেন সবার সাথে। ঘুরে দেখতে দেখতে কখন যে এই স্বর্গের মধ্যে এক ঘণ্টা হয়ে গিয়েছে তা বুঝতে পারিনি। মার্গারেট বলল এই হ্যাভেনেই আমি মরতে পারতাম। শুনে শান্তি লাগছিল। দেশ থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে পাহাড়ের মধ্যে সভ্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় নিজের সুখের প্রকৃত মর্ম হয়তো খুঁজে পাওয়া যায়। 

রুট ও খরচের খসড়া

স্পিতি ভ্যালি যেতে হলে আপনার দরকার হবে একটি ভারতীয় ভিসা। যে কোনো পোর্ট দিয়ে প্রবেশ করে কলকাতা থেকে ট্রেন, বাস বা বিমানে যেতে হবে দিল্লি অথবা চণ্ডীগড়।ট্রেনে শ্রেণীভেদে দিল্লি বা চণ্ডীগড়ের ভাড়া পড়বে ৬৭৫ থেকে ৩,৫০০ রুপি। বিমানে পড়বে ২,৪০০ থেকে ১২,০০০ রুপি।  এই জায়গাগুলো থেকে বাস পাওয়া যাবে মানালির। বাস ভাড়া পড়বে ৪৯০ রুপি থেকে ১,৪০০ রুপি।

মানালি থেকে কাজা গামি একটি HRTC এর লোকাল বাস চলাচল করে বছরে ছয় মাস ভোর পাঁচটায়, এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। বাস ভাড়া ৩০০ রুপি। অথবা ট্যাক্সি ভাড়া করে সরাসরি চলে যেতে পারেন কাজায়। ভাড়া পড়বে ৮০০ রুপি শেয়ারে গেলে, আর পুরো ট্যক্সি ভাড়া করলে পড়বে ট্যক্সির ধরন অনুয়ায়ী ৬,০০০-১০,০০০ রুপি। HRTC এর বাসের টিকেট যাবার ন্যূনতম দুই দিন আগে ও ট্যক্সি ভাড়া করতে হবে যাত্রার আগের দিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *