in

স্বপ্ন আর কল্পনার মাঝে নো ম্যান্স ল্যান্ড

জীপের মাঝখানে অরণ্য, ওর পাশে মাধবী, বাইরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি, ডানে এঁকেবেঁকে চলে যাওয়া টয় ট্রেনের লাইন, যেটা জলপাইগুড়ি দিয়ে চলে গেছে দার্জিলিং পর্যন্ত অজস্র পাহাড় পেরিয়ে। পিচ ঢালা মিহি রাস্তায় ১০ মিনিট যেতে না যেতেই বড় বড় পাইন বনের মধ্যে ঢুকে গেল ওরা। বেশ ঘন কালো অন্ধকারে ছেয়ে গেল চারপাশ। একটু পরেই পাইনের অন্ধকার শেষ হতেই রাস্তার দুইপাশ জুড়ে চা-বাগানের সবুজ সমুদ্রশুরু হলো। সেই সাথে অরণ্যর মনটাও ধীরে ধীরে সতেজ হতে থাকলো। ঠিক যেমনটি স্বপ্নে দেখেছিল এখানে আসার আগে, অনেকটা তেমন করেই।

কত স্বপ্ন আর আল্পনা। অধরা আর অরণ্যর ভাবনার রাজ্য জুড়ে। ভিসা পেলে ওরা একসাথে ঘুরবে দার্জিলিং এর চা বাগানে, মেঘ ছোবে কালিম্পংয়ের, পাহাড়ের পিঠে হেলান দিয়ে বৃষ্টি দেখবে লাভার কোনো কটেজে বসে, স্তরে স্তরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা রঙ বেরঙের পাহাড় দেখবে রিশপের চুড়ায় উঠে! বরফে বরফে আচ্ছাদিত পৃথিবীর অন্যতম সব পাহাড় চূড়া দেখে মুগ্ধ হবে, সান্দাকফু থেকে, আরও দেখবে রডেনড্রনের সমাহার, পাইনের আচ্ছাদিত সবুজ বনে সাদা বরফের বিছানা, টুমলিং এর টুংটাং! তিস্তায় রাফটিং, হারাবে ডুয়ারসের গহীন অরণ্যে, আবেগে ভাসবে স্বর্গ ছেড়া চা বাগানে, টাইগার হিলের বর্ণিল আকাশে আর দার্জিলিংয়ের নীল আকাশে।

দার্জিলিং। ছবিঃ লেখক 

আর সমরেশের জীবনকে বদলে দেয় সাতকাহনে, জীবনকে গড়তে সেখার উত্তরাধিকারে, ভালোবাসায় পাগল করা কালবেলায়, কল্পনা আর বাস্তবতার বিস্তর ব্যবধান শেখানো কালপুরুষে, পাহাড়ের টানে সব ভুলে যাওয়া গর্ভধারিণীকে, লেখা ও কোনো লেখককে ভালোবেসে ফেলা সুনীলের শিলিগুড়ি-জলপাইগুড়ির সমতলে।

কখনো সবুজ চা বাগানের মাঝে ঝমঝমে বৃষ্টি, রঙিন ছাতা মাথায় বর্ণিল অধরা আর অরণ্যর খালি পায়ে হেঁটে চলা! ছাতা থাকা সত্ত্বেও ওদের ভিজিয়ে দেয়া বৃষ্টির ছাঁট, আমলকী গাছের তলায় হেলান দিয়ে গুনগুন করা, হাতে হাত রেখে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একে অন্যকে অনুভব করা। সবই প্রায় মিলে গিয়েছিল শুধু অধরার জায়গায় এখানে মাধবী! আর হাতে হাত রেখে হেঁটে চলার পরিবর্তে জীপে করে মিরিক যাওয়া। চা বাগানের দিকে তাকিয়ে থেকে এমন ভাবনায় বিভোর অরণ্যর চেতনা ফিরলো, জীপের হঠাৎ করে ব্রেক করে থেমে যাওয়ায়।

পিছনের সিটের একজন আগেই নেমে যাওয়াতে অরণ্য জানালার পাশে বসেছিল। এবার আবার দুজন উঠলো। একদম গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসেছে সবাই। অরণ্যর পাশে আরেকটি মেয়ে বসলো শুকনা নামক জায়গা থেকে। মেয়েটি ওঠার পর থেকেই কেমন যেন একটা লাগছে অরণ্যর! একটা অদ্ভুত আনন্দ হচ্ছে, ওর গা ঘেঁষে বসে আছে অথচ কোনো অস্বস্তি হচ্ছে না কেন! অথচ মেয়েটির দিকে তাকানোও যাচ্ছে না, কীভাবে তাকাবে, কী ভাববে! তবুও একটু চেষ্টা করে জানার কাঁচে চোখ রেখে দেখতে চেষ্টা করলো অরণ্য।

মিরিকের পাহাড়ে। ছবিঃ লেখক 

মাথায় বেশ ঢঙ্গি একটা হ্যাট, রঙিন ফতুয়া আর তার রেশমি কোমল খোলা চুল! বাতাসে মাঝে মাঝেই যা ছুঁয়ে যাচ্ছে অরণ্যকে! যে চুলের ছোঁয়ায় একটা অদ্ভুত শিহরণ হচ্ছে অরণ্যর! মনে হচ্ছে এই স্পর্শ আর সুখ ওর অনেক অনেক দিনের চেনা, উহ আর তার গায়ের যে গন্ধটা বাতাসের ঝাঁপটায় নাকে এসে লাগছিল, যেন হারিয়ে যাচ্ছিল অরণ্য! কোনো এক অনেক চেনা আপন গন্ধে মাতাল হয়ে!

বাইরে বৃষ্টি, হালকা বাতাস, সবুজ চা বাগানে আনন্দের নৃত্য, মাঝে-মাঝে ঘন জঙ্গল, গাঢ় অন্ধকার, রোদের লুকোচুরি, ভেতরে পাশের সিটে গা ছুঁয়ে বসা কোনো সুন্দরী, তার চুলের নরম স্পর্শ, গায়ের মাতাল করা গন্ধ! ওপাশে মাধবী, আর অধরার জন্য অপেক্ষা! সব যেন অপার্থিব কিছু ঘটে চলেছে অরণ্যর জীবনে।

একটু পরে জীপ পাহাড়ের আঙিনার শুরুতে ঢেউ খেলে যাওয়া রাস্তায় উঠতেই একটা বিদ্যুৎ স্পর্শ যেন অনুভূত হলো অরণ্যর বাম হাতে! পাশে বসা সেই স্নিগ্ধ রূপের, খোলা চুলের ক্ষণে ক্ষণে ছুঁয়ে যাওয়া পরিচিত শিহরণ আর গায়ের চেনা গন্ধে মাতাল করা মেয়েটি হাত রাখলো অরণ্যর হাতে! বিস্ময়ে মুখ ঘোরালো অরণ্য মেয়েটির দিকে। হাত তো অবশ হয়ে গেছে, মেয়েটিকে দেখে! মাথার হ্যাট খুলে, মুখের চুল সরিয়ে আর চোখের সানগ্লাস খুলে তাকালো অরণ্যর দিকে! আরে এ যে অধরা!!

সুখের ছবি। ছবিঃ সংগ্রহ 

তুমি! এখানে?

হ্যাঁ, আমি, আমি-ই! তোমাকে চমকে দেব বলে মাধবীকে দিয়ে এমনটা করিয়েছি!

উহ, তোমরা মেয়েরা এত এত ক্লাইমেক্স করতে পারো না! ভাবতেই পারিনি। সুখের শিহরণে শিহরিত অরণ্য যেন হাওয়ার উড়তে লাগলো, মেঘে ভাসতে শুরু করলো, বৃষ্টিতে হাত ছুঁয়ে সুখের পরশে ভিজতে থাকলো নিজের মতো করেই।

এরপর ওরা পাহাড় ডিঙিয়ে, মেঘে ভেসে, বৃষ্টিতে ভিজে, কুয়াশা জড়িয়ে, সবুজে মিশে মিশে গিয়ে পৌঁছালো মিরিক লেকের একেবারে পা ঘেঁষে। তিনজন মিলে লেকের পাশ ধরে হেঁটে হেঁটে, গল্পে-কথায় আর হাসি-আনন্দে মেতে উঠলো। অরণ্য আর অধরার এত এত দিনের অসহ্য অপেক্ষার অবসান হলো তবে। কিন্তু এই আনন্দ খুব বেশীক্ষণ স্থায়ী হয়নি অরণ্য বা অধরার কারো কাছেই! কারণ অধরাকে চলে যেতে হবে দুপুরের পরেই।

ধুসর পথে ফিরে যাওয়া। ছবিঃ লেখক 

তাই ওরা মন খারাপ করে না থেকে পাহাড় চড়তে শুরু করলো। মিরিকের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত সুইস কটেজ আর হ্যালিপ্যাড দেখবে বলে। যেখান থেকে আবার নেপালের গ্রাম, কারশিয়াং, দার্জিলিংয়ের ঘরবাড়ি এবং আকাশ পরিস্কার থাকলে কাঞ্চনজঙ্ঘাও দেখা যায়! তাই ওরা আর দেরি না করে উঠতে লাগলো সেই পাহাড় চূড়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *