in

হিমেল হাওয়ায় নেপালি থাপার সাথে রক গার্ডেনে কিছুক্ষণ

রক গার্ডেনের ভেতরে কী আছে বা দেখতে কেমন এটার থেকে বেশি টানছিল রক গার্ডেন যাওয়ার রাস্তা। শুনেছি, রক গার্ডেন যাওয়ার পথ বেশ রোমঞ্চকর। পাহাড়ের সর্পিল পথ ধরে নিচের দিকে নেমে গেছে এই রাস্তা। রক গার্ডেন দার্জেলিং শহর থেকে অনেক নিচে। শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরত্বে এর অবস্থান।

রক গার্ডেন যাওয়ার পথেই মেঘ পাহাড়ের মিলন মেলা দেখা যাবে চা বাগানকে ঘিরে। জীপ পাহাড়ের গা বেয়ে যত উঁচু থেকে নিচুতে নামছে চা বাগান যেন আরও ঘন হয়ে দেখা দিচ্ছে দৃষ্টি সীমানায়। যত দূর চোখ যায় সবুজের গালিচা বিছিয়ে রেখেছে চারধারে, মাঝে মাঝে উড়ে যাচ্ছে পেঁজা পেঁজা মেঘ। এ যেন এক মন্ত্রমুগ্ধ করা দৃশ্য।

অরেঞ্জ ভ্যালিতে কিছুক্ষণ

দার্জেলিংয়ের বিখ্যাত চা বাগানগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে অরেঞ্জ ভ্যালী টি-ইস্টেট এবং হ্যাপি ভ্যালী টি-ইস্টেট। এর মধ্যে প্রথমটির দেখা মেলে রক গার্ডেন যাওয়ার পথে। মেঘ পাহাড়ের মিলন মেলা সাথে অসম্ভব সুন্দর রাস্তার দু’ধারে সবুজের গালিচার মধ্যে দিয়ে অপার্থিব দৃশ্য দেখতে দেখতে চোখের নিমেষেই পৌঁছে গেলাম রক গার্ডেনে।

জীপ থেকে নামতেই হিমেল হাওয়ার ঝটকা বুঝিয়ে দিয়ে গেল তার অস্তিত্ব। যেটুকু শীতের পোশাক ছিল তার সবটা গায়ে চাপিয়ে নিলাম। ওদিকে আমাদের জয় থাপা (মাসুদ ভাই ভালোবেসে জয়’দার নামের সাথে থাপা যুক্ত করেন) কোনো শীতের পোশাক না পরে মাথায় কান টুপি চাপিয়ে হনহন করে রক গার্ডেনে ঢুকে গেলেন। তো এই সাহসিকতার খেসারৎ অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে তাকে দিতে হয়। সে গল্পে পরে আসছি।

রক গার্ডেনে আমরা

রক গার্ডেনের ভেতর সুন্দর একটি ঝর্ণা আছে। আর সেই ঝর্ণার চারিধারে সিঁড়ি কেটে বানিয়েছে যাওয়ার পথ। একপাশ দিয়ে ওঠা, অন্যপাশ দিয়ে নামা। ঝর্ণাটা অনেকাংশে আমাদের দেশের খৈয়াছড়া ঝর্ণার মতো। রক গার্ডেন দেখে হুট করেই বিপু’দা বলল, আমাদের দেশের খৈয়াছড়াকে ঘিরে এমন কিছু বানান যেতে পারে।

ঝর্ণাকে ঘিরে চারিধারে হরেক রকম ফুলের গাছের ছড়াছড়ি। খুব সুন্দর করে সাজানো গোছানো রক গার্ডেন। তবে দার্জেলিংয়ের একটা বিষয় আমার খুব নজর কেড়েছে। তা হলো যেখানে সেখানে কোথাও কেউ ময়লা আবর্জনা ফেলছে না। এমনকি এই রক গার্ডেনে এত মানুষের ছড়াছড়ি তারও যত্রতত্র ময়লা ফেলছে না। ভেতরে প্রাণীর আদলে তৈরি ডাস্টবিন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সর্বত্র।

প্রাণীর আদলে তৈরি ডাস্টবিন; ছবি- সাইমুন ইসলাম

বাহারি রঙের ফুলের গাছ দিয়ে সাজানো রক গার্ডেনে বেশ ভালোই লাগছিল, সাথে হিমেল হাওয়া অন্যরকম এক ভালো লাগার সৃষ্টি করেছে। সামনেই নেপালিদের পোশাক পরে অনেক পর্যটক স্মৃতি ফ্রেম বন্দি করছে। ভিন্ন রকম সাজ পোশাকে ছবি তুলে স্মৃতির খাতা আরেকটু ভারী করতে চাই আমরাও। সম্ভবত ৫০ রুপি দিয়ে পোশাক ভাড়া করি। এখন প্রশ্ন হলো এই পোশাক পরবে কে?

সবার ভোটে জয়যুক্ত হলো আমাদের জয় থাপা। তাকে একরকম জোর করে পোশাক পরাই আমরা। জয়’দাকে নেপালি পোশাকে আসলেই ভালো লাগছিল। বিভিন্ন পোজে তার ছবি তোলা হয়। মজার ব্যাপার হলো তার অদ্ভুত সব পোজে ছবি তোলার সময় মোটামুটি আশেপাশে ভিড় পরে গেল দেখার জন্য। দেখার মতো দৃশ্য ছিল বটে!

আধুনিক থাপা; ছবি- সাইমুন ইসলাম

রক গার্ডেনে প্রবেশ মুখে দেখা যাবে কৃত্রিম এক পদ্মের। বেশ কিছু ছবি তুলে রক গার্ডেনের উপরের দিকে যাই। ঝর্ণার চারপাশটা ঘুরে দেখি। ধাপে ধাপে সিঁড়ি মূল ঝর্ণা পর্যন্ত উপরে উঠে গেছে। তবে ঝর্ণার উৎস পর্যন্ত যাওয়ার উপায় নেই। উপরের দিকে উঠতে কষ্ট হতে থাকে। পাহাড়ের সিঁড়ি বেয়ে যত উপরে উঠি হিম শীতল বাতাস তত বেগে বইতে শুরু করে।

রক গার্ডেনের বিভিন্ন জায়গায় বসার সুব্যবস্থা আছে। হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডায় টিকতে না পেরে আমি আর মাসুদ ভাই একপাশে গিয়ে বসে পড়ি। একটু পর জয়’দা এসে বলছে এখানে আর কিছুক্ষণ থাকলে সে ঠাণ্ডায় মারা যাবে। অন্যদিকে, সাইমুন আর সৌরভ ভাইয়ের ফটো সেশন যেন আর শেষ হতে চায় না। একাত সেকাত হয়ে তারা ছবি তুলছে।

সৌরভ ভাই আর সাইমুনের মডেলিং চলছে

পাহাড়ে ঝুপ করে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। এবার যে ফিরতে হয়। ৪টার দিকে জীপ করে শহরের দিকে ফিরছি। রক গার্ডেন যাওয়ার পথে অরেঞ্জ ভ্যালী টি-ইস্টেটে নামা হয়নি। তাই ফেরার পথে এখান থেকে দার্জেলিংয়ের চা কিনল সবাই পরিবার-পরিজনের জন্য।

অরেঞ্জ ভ্যালীর একাংশ; ছবি-লেখক

চা বাগানে কিছু ছবি তুলে আবার ফেরার তাড়া অনুভব করলাম। কেননা দুপুর থেকে পেটে কিছু পড়েনি। খিদেই পেট চো চো করছে সকলের। তাই জীপ করে সোজা চলে এলাম বিগ বাজার। অবেলা করে ভাত খেতে ইচ্ছে করছিল না কারও। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম ডোমিনজের পিৎজা খাব। আমি আগে যেহেতু খাইনি; তাই এটা ভালো না খারাপ বলতে পারছি না। এখানকার নাম ডাক শুনে খেতে রাজি হলাম। ক্ষুধার তাড়নায় এতই অস্থির ছিলাম ভালো খারাপ বিচার করার আগেই সব হজম হয়ে যায়।

খুদার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্নিমার চাঁদ যেন জ্বলসান রুটি।

সে যাই হোক, খাওয়া দাওয়া শেষ করে বিগ বাজার থেকে শুকনা খাবার আর হাল্কা পাতলা জিনিস কিনে রুমে যাই। এদিকে রুমের চাবি বিপু’দার কাছে। আর বিপু’দা আর সাইমুন এক ব্রাশ কিনতে গিয়ে বাজার কিনে ফেলছে প্রায়। কোনো উপায় না দেখে আমি আর মাসুদ ভাই বসে বসে ঝিমাই। তাদের যখন কেনাকাটা শেষ হলো, ক্লান্ত পায়ে হেঁটে হোটেল রুমে ফিরি।

স্ট্রীট ফুডের সন্ধ্যানে এবার

ফ্রেশ হয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেই। এবার দার্জেলিংয়ের স্ট্রীট ফুড খাবার পালা। শীতের কাপড় গায়ে চাপিয়ে আবার বেরিয়ে পড়ি মল চত্বরের স্ট্রীট ফুড খেতে।

*** ফিচার ইমেজ: বিপু বিধান

(চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *