in

দেরাদুনের দিনগুলো

অনেক দিন থেকে মনে মনে একটা ছোট্ট, কিন্তু বেশ দুর্লভ একটা স্বপ্ন দেখছিলাম যে এমন একটা বাড়ি, যে বাড়িটা হবে লাল ইটের তৈরি, বেশ পুরনো ধরনের একটা ছোট্ট বাড়ি। বাড়ির সামনে এক চিলতে ইট বিছানো ঘাসে ছেয়ে থাকা একটু পিচ্ছিল পথ থাকবে। পথের শুরুতে থাকবে একটা ছোট্ট লোহার সেকেলে গেট। যে গেটের লোহার বাঁধা খুলতে গেলেই ক্যাঁচ করে একটু শব্দ হবে। রাস্তা পেরিয়ে সামনের দিকে এগোতেই পথের দুই পাশে থাকবে ছোট্ট কিন্তু বেশ কাজের বাগান।

একপাশে ফুলের আর অন্য পাশে সবজির ছোট এক চিলতে বাগান। বাগানের পথ পেরিয়েই বাড়ির সামনে খোলা বারান্দা, যে বারান্দায় গরমে মাদুর বিছিয়ে ঝিরঝিরে বাতাস গায়ে লাগানো যাবে। একটি ছোট্ট দোলনা দুলবে লোহার রড বা পাটাতনের সাথে বাড়ির ছোট্ট কোনো সদস্যের জন্য, একটা হাতলওয়ালা চেয়ার বা প্রাচীন আরাম কেদারা থাকবে যেখানে বসে বা দুলে দুলে চশমার ফাঁক দিয়ে চোখ বোলাবে কেউ পুরনো পেপার বা কোনো প্রিয় বইয়ের পাতায়।

এক মুগ্ধ পথে… ছবিঃ লেখক 

বারান্দার সাথে লাগোয়া গাছের পাতার ফাঁক ফোঁকর দিয়ে এক চিলতে রোদ এসে পড়বে কালো, সিমেন্ট উঠে যাওয়া পুরনো বাড়ির বারান্দায়। আরাম কেদারার পাশের ছোট্ট টেবিলে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা এনে রাখবে প্রিয় কোনো হাত। একটা সুখের স্পর্শ এসে লাগবে কপালে, ক্ষীণ সময়ের জন্য কিন্তু ছুঁয়ে যাবে অতলে। সুখের স্পর্শ পেয়ে চোখ রাখবে বারান্দা থেকে দুই বাগানের মাঝের এক চিলতে ইট বিছানো পথে।

চোখে পড়বে, চারপাশে অগোছালো গাছপালায়, যেগুলো সবুজে ছেয়ে থাকবে, তার চারপাশে নীরব প্রকৃতি, প্রায় শব্দহীন পথে ছুটে যাবে একটি দুটি সাইকেল টুং টাং শব্দ করে, গাছপালা, সবুজ ঘাস, নীরব অরণ্য, ফুল বিছানো পথ একটা প্রশান্তি বিলিয়ে দেবে সবটুকু জুড়ে। চেয়ে থাকা, অনুভব করা আর বেঁচে থাকাটাকে বড় মধুর করে তুলবে মুহূর্তেই।

কিন্তু অনেক অনেক ঘুরেও সবকিছুর এমন সমন্বয় কোথাও খুঁজে পাচ্ছিলাম না। শহরে তো এসবের প্রশ্নই আসে না, এমনকি আমাদের গ্রাম বা মফঃস্বলেও এমন খুঁজে পাওয়া আজকাল খুব খুব দুর্লভ একটা ব্যাপার। এই কদিন আগে সান্তাহারের নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে এমন কাছাকাছি ধরনের দুই একটি বাড়িঘর স্টেশনের আশেপাশে খুঁজে পেলেও নীরব প্রকৃতি কোথাও খুঁজে পাইনি। চারদিকে মানুষ, গান, বাজনা, বাইকের কর্কশ শব্দে প্রকৃতি হাসির বদলে দুঃখ বিলিয়ে দিয়েছে। আর কোথাও ঘুরতে গেলে তো আজকাল অবসর যেন সোনার হরিণ হয়ে যায়। চুপচাপ বসে থাকার চেয়ে ছুটে বেড়ানোটাই প্রধান হয়ে যায়।

সবুজ ঘাসে সুখের সৃতি। ছবিঃ লেখক 

কিন্তু গোমুখ থেকে দেরাদুন ফিরে হুট করেই একদিন বেশী সময় পেয়ে যাওয়াতে মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম, এবার একদিন আর কোনো ছোটাছুটি নয়, একদমই নয়। একদিন শুধু চুপচাপ বসে বা ধীর লয়ে হেঁটে হেঁটে বেড়াবো কোন এক প্রকৃতির মাঝে, বসবো গাছের ছায়ায়, হাটবো ফুল ঝরে পরে লাল বা হলুদ হয়ে যাওয়াকোন পথে, শিশিরের স্পর্শে শিহরিত হব কোনো এক নীরব সকালে, শিউলি ঝরা ঘাসে গড়াবো আপন মনে আর সকালের ঝিরঝিরে বাতাসে চুপ করে বসে থাকবো কোনো এক আড়ালে। যেখানে কেউ থাকবে না,কেউ আসবে না, কেউ ডাকবে না, কেউ দেখবে না। একদম নিজের মতো করে কাটাবো একটি দিন।

তো যে দিনটিকে এভাবে একদম অলসভাবে কাটাবো বলে ধরে নিয়েছিলাম। ভেবে রেখেছিলাম সেদিন দেরাদুনের খ্যাতিমান একটা স্থাপনা দেখতে যাবো একদম অলসভাবে। যেখানে স্থাপনার সাথে নিশ্চিতভাবেই আছে নীরব প্রকৃতি আর গভীর অরণ্য আর সেটা হলো, দেরাদুনের বন গবেষণা কেন্দ্র বা Forest Research Institute সংক্ষেপে (FRI)। তো এখানে যাবার আগে এক বন্ধু পরামর্শ দিয়েছিল গেট দিয়ে ঢুকেই ছোট ছোট গাড়ি পাওয়া যায়, যেটাতে করে টাকার বিনিময়ে মোটামুটি এক ঘণ্টার মধ্যেই পুরোটা দেখা হয়ে যাবে। তাই সেখানে গিয়ে ভাবলাম, আমার তো কোনো তাড়া নেই, তাহলে গাড়ি কেন নেব? কী দরকার? হেঁটে হেঁটে, ধীরে ধীরেই তো দেখতে পারি। যেই ভাবনা, সেই কাজ। দর্শনার্থীদের কমন পথ ছেড়ে আমি একদম নীরব আর আবাসিক এলাকার পথে পা বাড়ালাম।

অগোছালো অরণ্যের মাঝে। ছবিঃ লেখক 

ভাগ্যিস কমন পথে না এগিয়ে এই পথে এগোতে শুরু করেছিলাম। যে কারণেই অনেক দিনের সুপ্ত ইচ্ছা, ছোট্ট স্বপ্ন আর নিজের মনের মতো করে, কল্পনার রঙে সাজিয়ে রাখা সবকিছু যেন একে একে ধরা দিতে থাকলো চোখের সামনে। ভাবনার সবটুকুকে সত্যি করে দিতে।

হাঁটা শুরু করতেই দূরে সবুজের ফাঁক ফোঁকর দিয়ে চোখে পড়লো লাল ইটের একটি পুরনো একতলা বাড়ি। সেদিকে এগোতে থাকলাম আর কী কী আছে মনের মতো রঙে সেজে তা দেখার জন্য। কাছে যেতেই চোখে পড়লো দুইপাশে বেশ ঘন অগোছালো জঙ্গলের মতো গাছ, লতা, পাতায় ঘেরা চারপাশের ঠিক মাঝখানে একটি ছোট্ট লোহার গেট, ঠিক যেমনটি চেয়েছিলাম, মনে মনে ভেবেছিলাম। নাহ গেটের ভিতরে ঢুকিনি, বাইরে থেকেই দেখলাম দাঁড়িয়ে থেকে, যতটা দেখা যায়।

ইটের বাড়ি, ওটা আসলে ওদের কোয়ার্টার। টিনের চালা, খোলা বড় বারান্দা, ছোট্ট উঠোন, বাগানে সবজি আর ফুলের সমারোহ। একদম ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে দেখছিলাম বাড়ি বা কোয়ার্টারের বারান্দায়। দেখছিলাম কাঠের চেয়ারে কেউ একজন বসে কিছু একটা পড়ছে, কিন্তু সেখানে এক নারী কাজ করে চলেছে বিধায় ছবি তুলতে পারিনি।

লাল নীল আর সবুজের সাঁজ। ছবিঃ লেখক 

হঠাৎ গায়ে একটু রোদ পড়াতে ছায়া খুঁজে দাঁড়াবো বলে নিচের দিকে তাকালাম। নিচের পাকা রাস্তায় আর সবুজ ঘাসের দিকে তাকিয়ে সুখে, আনন্দে চোখে পানি চলে এসেছিল আমার! হ্যাঁ সত্যি, সত্যি তাই। কারণ তাকিয়ে দেখি পুরো পথের পিচ, সবুজ ঘাসের উপরে এক অপূর্ব সাদা আর গোলাপি ফুল ঝরে আছে। যা ভাবছিলাম, কীভাবে সম্ভব এমন করে সকল চাওয়া একদম পূর্ণ হয়ে যাওয়া? সত্যি-ই কি, না স্বপ্ন দেখছি? উপরে তাকালাম ফুল ঝরে পরা গাছটা দেখবো বলে।

হায়, এ কী দেখছি নীল আকাশের মাঝে যেন এক টুকরো গোলাপি আর লাল এলোমেলো ফুলের মেলা বসেছে যার মাঝেই অল্পসল্প সবুজ পাতা দুয়েকটা। ভাবা যায়, নীল আকাশের মাঝে মাঝেই গোলাপি ফুলের সাজ? সেই মুহূর্তে আমার আর কিছুই চাওয়ার ছিল না। আমি খুশিতে পূর্ণ হয়ে গিয়েছিলাম। সেই রোদ, আলো, ছায়া, ঝিরঝিরে বাতাস, ঝরে পড়া ফুলের অপূর্বতার মাঝে ঠায় বসেছিলাম অনেক অনেক সময়। আর ভাবছিলাম…

স্বপ্নের মত পুরনো এক বাড়ি। ছবিঃ লেখক 

চাইলেই কত কিছু দেখা যায়, চাইলেই কত অল্প থেকেই সুখ আর আনন্দ খুঁজে নেয়া যায়, চাইলেই একদম সাধারণ প্রকৃতির মাঝ থেকেই অন্য রকম সুখে হারিয়ে যাওয়া যায়। পাহাড়, সমুদ্র, অরণ্য এসবে তো সব সময়ের জন্যই কোনো না কোনো আনন্দ থাকে। কিন্তু এমন সাধারণ জায়গাতেও যে এত অপূর্ব কিছু থাকতে পারে, পেতে পারি সেটা ভাবতেই পারিনি। দারুণ আর সত্যি, দারুণ কেটেছিল দেরাদুনের বন গবেষণা কেন্দ্রের সেই সকালটা। আর এরপরে তো আরও কত কত কী যে অপেক্ষা করছিল, জানতামই না। বলবো পরে অন্য কোনো গল্পে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *