in

দেরাদুনে পথ হারিয়ে

দেরাদুনের দ্বিতীয় দিন বিকেল। আগের দিন বিকেল সন্ধ্যা কাটিয়েছি মুঘল খাবার, কাবাব, বিরিয়ানি খুঁজে, খেয়ে আর ধীর লয়ে রাতের দেরাদুনের লোকাল হাট-বাজার দেখে দেখে। পরদিন সকাল থেকে শেষ দুপুর পর্যন্ত কেটেছে অনিন্দ্য সুন্দর বন গবেষণা কেন্দ্রে ঘুরে, বসে, হেঁটে আর উপভোগ করে। বিকেল আর সন্ধ্যাটা রেখেছিলাম একটা বিশেষ জায়গায় আরও অলসভাবে সময় কাটাবো বলে। যে জায়গাটা দেখেছিলাম সপ্তাহের শুরুতে দেরাদুন থেকে মুশৌরি হয়ে উত্তর কাশী যাবার পথে, চলন্ত বাসে বসে।

যাবার সময় চলন্ত বাস থেকে পথের দু’পাশ দেখে খুব অবাক হয়েছিলাম। দেখছিলাম আর ভাবছিলাম এ কেমন হাইওয়ে যার দুইপাশে ফুটপাথ নাকি কোনো পার্ক! ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। এতই সাজানো, গোছানো আর নান্দনিক সাজ পথের দুই পাশের যে আসলে এটা পার্ক না ফুটপাথ সেটা দেখার জন্য ঠিক করে রেখেছিলাম। দেরাদুনে ফিরে সময় পেলে এই জায়গাটা অবশ্যই ঘুরে দেখতে হবে। আর সেভাবেই দেরাদুনের দ্বিতীয় দিন বিকেলে সেই অবাক করা পথের দুই পাশের পার্ক বা ফুটপাথ দেখতে বের হলাম পায়ে হেঁটে।

দেরাদুনের পথে ঘাটে। ছবিঃ লেখক 

কোনো ভ্রমণে এর চেয়ে ধীর লয়ে কোথাও হেঁটেছি বলে মনে পড়ে না। এতই ধীরে আর এতই ধীরে হাঁটছিলাম যে, দেরাদুন রেলস্টেশন থেকে শুরু করে সামনের মোড়ে যেতে যেতেই ১০ মিনিট লেগে গিয়েছিল। যেখানে মাত্র এক মিনিটেই যাওয়া যায়। এই বিকেলের এমন ধীর লয়ে হেঁটে বেড়ানোর দুটো উদ্দেশ্য ছিল। একটি তো আগেই বলেছি পথের পাশের পার্ক বা ফুটপাথ দেখবো আর অন্যটি হলো, একই পথের দুইপাশে বাসে যাওয়ার সময় নানা রকম আধুনিক আর নান্দনিক কিছু বোর্ডিং স্কুল চোখে পড়েছিল। আর সেই সাথে বাড়তি পাওয়া হবে নতুন কোনো শহরের অলিগলি ঘুরে দেখার ভিন্ন রকম একটা স্বাদ।

যে কারণে হাঁটছি তো হাঁটছি। এটা, সেটা, ওটা দেখছি। পথের ধারের কোনো এক মোড়ে ইচ্ছা হলেই দাঁড়িয়ে গেছি, ধুলো ওড়া কোনো এক মাঠে ফুটবল খেলা দেখে থেমে গেছি, কোথাও কোনো পার্কের মাঝে সবুজ বনভূমি দেখে দাঁড়িয়ে পড়েছি আবার কখনো বনেদী কোনো ভবন দেখে থমকে গেছি। এইসব অলসতায়, মন আর চোখের ইশারায় হাঁটতে হাঁটতে কখন যেন মুশৌরির পথ হারিয়ে অন্য কোন পথে চলে গিয়েছি সেটা খেয়ালই করিনি। আর এই পথে হারিয়ে একটা গোলক ধাঁধাঁর মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম শুরুর দিকে। তবুও ঠিক করেছিলাম কাউকে জিজ্ঞাসা করব না। নিজে নিজেই যে পথে যেতে চেয়েছিলাম সেই পথ খুঁজে নেব, নইলে যা হবার হবে, এদিক-সেদিক ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে গেলে রাতের খাবার খেয়ে রুমে ফিরবো।

দেরাদুনের পথে পথে বর্ণীল আয়োজন। ছবিঃ লেখক 

তাই হাঁটছিলাম আর সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম একান্তই আপন মনে, চোখের ইশারায় আর হুটহাট চোখে পড়া নতুন নতুন পথের দিকে। এভাবে হাঁটতে হাঁটতেই চোখে পড়লো গান্ধী পার্ক, চার রাস্তার একদম মোড়ের উপরে বেশ গোছানো একটা সবুজ পার্ক। তখন শেষ বিকেল, ভাবলাম কাল সকালটা এই পার্কের জন্য বরাদ্দ থাকলো। আবার সামনে এগোতে থাকলাম, কয়েকটি দারুণ স্কুল দেখে গেটের ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে একটু উঁকিঝুঁকি মারলাম, দারোয়ানের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করেই কীভাবে স্কুল দেখা যায় জানতে চাইলে জানালো, সকাল ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত ভিজিটর আওয়ার। সেই সময়ে এসে দেখতে পারবেন, অন্য কখনো নয়। বেশ তাই ভালো, এটাও আগামী কালকের জন্য বরাদ্দ রেখে সামনের দিকে পা বাড়ালাম। ততক্ষণে সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে দেরাদুন শহরের অলিগলিতে আর মোড়ে মোড়ে।

এবার একটু ভাবনায় পড়লাম, আমি কি তবে সেই কাঙ্ক্ষিত পথ আর খুঁজে পাবো না? যাক, পেলে ভালো আর না পেলে আরও ভালো! নিজেকেই নিজে বোঝালাম। আরও একদিন তো হাতে রয়েছেই। আজ না পেলে কাল সকালে বাসেই চলে যাবো সেই পথে খুঁজে-পেতে। আজ না হয় এমন উদ্দ্যেশ্যহীন ভবঘুরে হয়েই কাটিয়ে দেই এই সন্ধ্যা, তার নিয়ন আলো, আলো-আঁধারিতে ঢাকা রাজপথ, অন্ধকার পার্ক, ঝলমলে রেস্টুরেন্ট আর শপিংমল দেখে দেখে। ততক্ষণে বিকেল শেষ হয়ে সন্ধ্যা নেমে গেছে আধুনিক আর প্রাচীনের মিশেলে প্রতিষ্ঠিত দেরাদুন শহরে।

প্রাচীন চার্চ। ছবিঃ লেখক

তাই সেদিনের মতো কাঙ্ক্ষিত পথের নান্দনিকতা আর পার্কের খোঁজ করা বাদ দিয়ে যতগুলো অলিগলি চোখে পড়ে সেদিকে পা বাড়াতে লাগলাম। কারণ আর যাই হোক রাতের আঁধারে ওই নির্জন পথের ধারের পার্কে যাওয়াটা একদম ঠিক হবে না বলেই মনে হলো। আরও যে পথের দুই পাশেই আছে ঘন অরণ্য আর পাহাড় সারির নিস্তব্ধতা। সেটা উপভোগ্য হলেও কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হবে কি হবে না সেই প্রশ্ন মনে এসেছিল।

তাই পথের ধারের বনেদী স্থাপনা, প্রাচীন আমলের চার্চ, পুরনো বইয়ের দোকান, বার্মিজ বা চাইনিজ মার্কেট, বাসস্ট্যান্ড, স্কুল-কলেজ আর নানা রকম রঙ বেরঙের আলোর মাঝেই হেঁটে হেঁটে অজানা পথে ঘুরছিলাম। এই অজানা পথে ঘুরতে ঘুরতেই একটা জায়গায় দেখি অনেক লোকের সমারোহ, দারুণ ভিড়, চিৎকার-চেঁচামেচি আর ঠেলাঠেলি। কী ব্যাপার দেখা দরকার তো? আমিও মিশে গেলাম সেই ঠেলাঠেলি আর তুমুল ভিড়ের মধ্যে। ভিড়ের মাঝে, দারুণ ঠেলাঠেলিতে কখন যেন দোকানের ভেতরে ঢুকে গেলাম বুঝতেই পারিনি। আর সেই দোকানের ভেতরে ঢুকেই তো অবাক হয়ে গেলাম।

পানীয়র দোকানের ভিড়! ছবিঃ লেখক

কারণ সেদিন ছিল শনিবার। সপ্তাহের শেষ কর্মদিবস শেষে অফিস ও নানা রকম কাজে ব্যস্ত মানুষজন আবাসে ফিরছে। পরদিন রবিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন। তাই একটি পানীয়র দোকান অর্ধেকেরও কম দামে নানা রকম পানীয় বিক্রি করছে। অতি অল্প দামে যত খুশি তত খাও হিসেবে বিক্রি করছে ভেতরে আর সাথে আছে নানা রকম ভাজাভুজি। সবাই পাগলের মতো ৩০ রুপী করে দিয়ে ইচ্ছেমতো পানীয় নিয়ে ভাজাভুজি দিয়ে গোগ্রাসে গিলছে। দেখে তো আমার মাথা খারাপের জোগাড়। কারণ এমন কাণ্ড আমি কোনোদিন কোথাও দেখিনি আর শুনিওনি।

এসব দেখে দেখে, নতুন নতুন
অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে যখন সন্ধ্যা শেষ হয়ে পুরোপুরি রাতের আয়োজন হয়ে গেছে দেরাদুন
শহরে, মানে ধীরে ধীরে দুই একটা দোকানের আলো নিভে যেতে শুরু করেছে তখন ফিরতি পথ ধরে
চলে গিয়েছিলাম রাতের খাবার কিনে নিয়ে রুমে ফিরতে।

তবে এই যে অযথা ঘোরাঘুরি, কাঙ্ক্ষিত পথের দেখা না পাওয়া, এসব কোনো কিছুই কেন যেন মন্দ লাগেনি এতটুকু। কারণ নতুন একটি শহরের কত নতুন নতুন মানুষ দেখেছি, তাদের জীবন যাত্রা দেখেছি, ওদের আচার-আচরণ দেখেছি, সংস্কৃতি দেখেছি, যেটা একদম নির্জন কোনো জায়গায় গেলে আসলেই দেখতে, জানতে বা বুঝতে পারতাম না। তাই সব সময় পাহাড়, অরণ্য, সমুদ্র আর বরফের মাঝে গিয়েই যে আনন্দ পাওয়া যায় সেটা ঠিক নয়।

রাজপথের ধারে সবুজের আচ্ছাদন। ছবিঃ লেখক

কখনো কখনো উদ্দ্যেশ্যহীন হেঁটে বেড়িয়ে, নতুন কোনো শহরের অলিগলি ঘুরে, মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে থেকে, নানা রকম মানুষ আর তাদের জীবন যাপন দেখেও অনেক কিছু দেখা যায়, শেখা যায়, পাওয়া যায় আর জীবনকে অন্যরকমভাবে উপভোগ করা যায়। যেটা আমি উপলব্ধি করেছিলাম সেদিন…

দেরাদুনে পথে হারিয়ে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *