in

ফুলে ফুলে কাশ্মীর

কাশ্মীরে এমনিতেই দেখার কোনো শেষ নেই, নেই উপভোগের কোনো শেষ আর তাই নেই সুখের কোনো সীমা-পরিসীমা। যার কারণেই প্রায় দুই বছর আগে কাশ্মীর ঘুরে আসার পরে আজও সেই রেশ রয়ে গেছে! রয়ে গেছে সুখের স্মৃতিগুলো অমলিন।

ছবিগুলো যেন এখনো হাতছানি দিয়ে ওর কাছে ডাকে, আর তাই আরও একবার কাশ্মীর যেতে না পারার অভাবটা আমি লিখে লিখে কিছুটা প্রশমিত করার চেষ্টা করে যাই, যাচ্ছি আর আরও একবার না যেতে পারা পর্যন্ত হয়তো লিখেই কাশ্মীরের তৃষ্ণা মেটাতে হবে আমাকে।

বাগান নয়, যেন ফুলের মালা! ছবিঃ সালমান

কাশ্মীর থেকে ফিরে যেসব জায়গায় গিয়েছি, ঘুরেছি আর দেখেছি সেসব জায়গা নিয়ে নিজের মতো করে লিখেছি। আর আজকাল যখনই যে স্মৃতি, যে ছবি, যে মুহূর্তগুলো মনে পড়ে, হৃদয়ে নাড়া দেয়, অবাধ্য আর উন্মাদ করে দেয় কাশ্মীর যাবার জন্য তখনই সেই জায়গা, সেই ছবি আর সেই সুখের স্মৃতি নিয়ে কিছু না কিছু লিখে ফেলি।

লিখি যেন নয়, তখন সেই জায়গাতেই আমি আছি বা থাকি। আমি যখন আমার ভ্রমণের অগোছালো গল্পগুলো লিখি, তখন সব সময়ই আমি শারীরিকভাবে না হলেও মানসিকভাবে, অন্তর দিয়ে, হৃদয় দিয়ে আমি যেন তখন সেখানেই থাকি।

নাম না জানা ফুল। ছবিঃ সালমান 

এই যেমন কদিন থেকেই কাশ্মীরের শত রকমের, রঙের আর ঘ্রাণের ফুলগুলো আমাকে পাগল করে তুলেছে। ওর মিহি সবুজ মখমলের মতো ঘাসের গালিচা আমাকে অস্থির আর অবাধ্য করে তুলেছে। আমাকে ব্যাকুল করে তুলেছে শ্রীনগর, গুলমার্গ, পেহেলগাম, আরু আর বেতাব ভ্যালীর বাগানের অপার্থিব গোলাপগুলো।

কত যে রঙের, বর্ণের আর আকারের- কী করে যে বোঝাই? কত রকমের ডালিয়া, কসমস, সূর্যমুখী, গাঁদা সহ নাম না জানা কত শত ফুলের যে সমারোহ সেসব প্রাচীন বাগানে, নিজ চোখে না দেখলে বলে বা লিখে বোঝানো মুশকিল।

সাদার শুভ্রতা। ছবিঃ সালমান

ফুলের নাম আর জানবো কখন, তার রঙ আর ঢঙ দেখেই তো আমি দিশেহারা হয়ে গিয়েছিলাম। বড় বড় গাছে সাদা রঙের ফুলের যে শুভ্রতা আর মাধুর্য কীভাবে বললে যে সঠিকভাবে বর্ণনা করা হবে আমার জানা নেই। এক লালের যে কত রকমের শেড সেটা কাশ্মীরের গোলাপ না দেখলে কেউ বললেও বিশ্বাস করতাম কিনা সন্দেহ আছে।

গোলাপের যে এত এত রকমের ঘ্রাণ হতে পারে রঙ ভেদে, আলাদা আলাদা আর এক একটার এক এক রকম মাদকতা মাখা সেটা কোনো সুদূরতম কল্পনাতেই ছিল না এতদিন।

উহ গোলাপের কি রঙ! ছবিঃ সালমান

এমনকি আগাছার মতো কোনো এক বাগানের এক কোণায় অবহেলায় পড়ে থাকা নাম না জানা ফুলেরও যে আভিজাত্য, যে আকর্ষণ, যে মায়া আর যে সম্মোহন নিজের চোখে না দেখলে বলে বোঝানো যাবে না। আর তাদের কী রঙ, টকটকে, ঝকঝকে আর ঝলমল করে হেসে ওঠে, যে কোনো পথিকের চোখে চোখ পড়লেই। হোক সেটা ঝলমলে রোদেলা দুপুর বা ধূসর মেঘে ঢেকে থাকা কোনো অলস বিকেল অথবা সদ্য চোখে মেলে তাকানো কোনো আধো ঘুমন্ত ভোর। সেসব ফুলেরা আপনাকে দেখেই হেসে উঠবে আপন মনে।

আপনার মনে রঙ লাগিয়ে দেবে আপনারই অজান্তে। মন যদি কোনো কারণে খারাপও থাকে, ওই নিস্পাপ ফুলেদের অসম্ভব সুন্দর হাসি দেখে কিছুতেই আর মন খারাপ থাকবে না কারো। থাকতেই পারে না। মনের মাঝে এতটুকু কোমলতা যদি কারো থেকে থাকে।

গাছ নয় যেন গোলাপের থোকা! ছবিঃ সালমান 

লাল, গোলাপি, খয়েরি, হলুদ, সাদা, বেগুনী, মেজেন্ডা, অফ হোয়াইট, এক রঙের মাঝেই অন্য রঙের মিশ্রণ- কী নেই? আর তাদের ঘ্রাণ সে তো পাগল করা, মাতাল করা, আপ্লূত করার মতো। বিশেষ করে গোলাপের যে কী ঘ্রাণ, আহা লিখতে লিখতেই যেন একবার নাকে এসে লাগলো বুঝি! এমনই তার টান, আকর্ষণ আর সম্মোহন।

কিন্তু আমরা কজন কাশ্মীর গিয়ে ফুল দেখি আসলে? কজনই বা ওদের অমন নির্মল আর নিস্পাপ হাসি দেখি, কজনই বা ওদের মাদকতাময় গন্ধ নেই মন প্রাণ আর বুকের সবটুকু নিঃশ্বাস ভরে? আমার জানা নেই। আমি দেখেছি, যখনই একটু একা হয়েছি, ফাঁকা থেকেছি, অন্য সবাই একটু দূরে চলে গেছে। আমি মন প্রাণ ভরে কাশ্মীরের ফুল দেখেছি, ওদের নরম কোমল আর আদুরে শরীরে নিজের আঙুল ছুঁইয়েছি, ওদের আলতো স্পর্শ নিয়ে নিজেকে ধন্য করেছি, আর গোলাপের নানা রকমের রঙ ও ঘ্রাণের মাঝে নিজেকে কতবার যে সঁপে দিয়েছি নিজেই জানি না।

অপূর্ব রঙের অজানা ফুল। ছবিঃ সালমান

এক একবার তো ইচ্ছে হচ্ছিল ইশ যদি একটি বাগান বা একটি গাছ অথবা কোনো একটা এমন রঙ আর ঘ্রাণের ফুলের চারা নিয়ে আসতে পারতাম তবে কী যে ভালো লাগতো! আবার ভেবে দেখেছি নাহ, ওরা ওদের জায়গাতেই ভালো আছে, নিজের মতো আছে, আমাদেরকে হাসি, আনন্দ, ঘ্রাণে ভরিয়ে রেখে, সুখে ভাসিয়ে দিচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে।

কী দরকার এই কলুষতার শহরে এনে কষ্ট দেয়ার? তাই আর নিয়ে আসিনি ওদের কাউকেই কষ্ট দিতে, দুঃখ দিতে, ব্যথা আর বেদনায় ভরিয়ে দিয়ে ওদের প্রাকৃতিক সুখ আর হাসি কেড়ে নিতে।

ডালিয়া। ছবিঃ সালমান

তবে ভুলেও যেতে পারিনি গোলাপের রঙ, ডালিয়ার ঢঙ, গাঁদার গন্ধ, সাদার শুভ্রতা, বুনো ফুলের টান, বাগানে বাগানে বর্ণীল ফুলের নাচন, বাতাসের গান আর মন মাতানো হাজারো ফুলের ঘ্রাণ। শ্রীনগরে, গুলমার্গে, পেহেলগামে, আরু ভ্যালীতে, বেতাব ভ্যালীতে আর মুঘল গার্ডেনের প্রাচীন বাগানগুলোকে।

বেগুনী ফুলের বাগান! ছবিঃ লেখক 

তাই ভাবছি আবার যেদিন কাশ্মীর যাবো, যেতে পারবো আর একটু সময় নিয়ে যাবো। যেন একটি দিন রাখতে পারি শুধুই কাশ্মীরের ফুল, তাদের রঙ, ঘ্রাণ আর হাসি উপভোগের জন্য। শুধুই কাশ্মীরের ফুলেদের জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *