in

সিলেটের বিছানাকান্দি ও রাতারগুলে একদিন

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত সিলেট একটি প্রাচীন জনপদ। ইতিহাস আর ঐতিহ্যগত দিক থেকে বেশ সম্পদশালী এই অঞ্চলটি বাংলাদেশের লন্ডন হিসেবে খ্যাত। এখানে বসবাসরত প্রত্যেক পরিবারের কেউ না কেউ লন্ডনে বসবাস করার জন্যই এই অদ্ভুত নামের প্রচলন ঘটেছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মন্ডিত এ অঞ্চলকে ঘিরে গড়ে উঠেছে দেশের বৃহত্তম পর্যটনশিল্প। আজ থাকছে সিলেটের বিছানাকান্দি ও রাতারগুল ভ্রমণের খুঁটিনাটি।

বিছানাকান্দি

সিলেট ভ্রমণের চিন্তা মাথাতে আসা মাত্রই যে জায়গাটির নাম সবার আগে মস্তিষ্কে কড়া নাড়ে সেটি বিছানাকান্দি। এটি সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার রুস্তমপুর ইউনিয়নের একটি গ্রামে অবস্থিত।

বিছানাকান্দি যাওয়ার পথে; সোর্সঃ শত্রুঘ্ন অর্পিত

বিছানাকান্দি জিরো পয়েন্ট নামে পরিচিত ট্যুরিস্ট স্পটটি মূলত বাংলাদেশ ভারত সীমান্তবর্তী এলাকা যেখানে বাংলাদেশের সিলেট ও ভারতের মেঘালয় রাজ্য এসে মিশেছে। এই পর্যটন এলাকাটি একটি পাথরের কোয়েরি যেখান থেকে পাথর উত্তোলন করা হয়। আশেপাশের স্থানীয় মানুষের জীবিকা নির্বাহের অন্যতম মাধ্যম এই পাথর উত্তোলনকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। এছাড়া এখানকার মানুষ নদীতে মাছ ধরে ও কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে।

রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট (Ratargul Swamp Forest)

গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত আরেকটি আকর্ষণীয় ট্যুরিস্ট স্পট রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট। সিলেট শহর থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এটি বাংলাদেশের একমাত্র মিঠাপানির জলাভূমি যার আয়তন ৩,৩২৫ একর। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ সরকার এর ৫০৪ একর বনকে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করে।

রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট; সোর্সঃ travelinginbangladeshi.blogspot.com

অবস্থানগতভাবে এই জলাভূমি ফতেহপুর ইউনিয়নের গুয়াইন নদীর দক্ষিণ তীর ঘেঁষে অবস্থিত। রাতারগুল ভ্রমণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময় বর্ষাকাল, তখন এই বন ২০-৩০ ফুট পানির নিচে নিমজ্জিত থাকে। বছরের বাকি সময় ১০ ফুটের মতো পানি থাকে।

সিলেট-হাদারপাড় ঘাট

বিছানাকান্দি যাওয়ার জন্য প্রথমে আপনাকে সিলেট শহরে যেতে হবে। শহরের মাজারগেট এলাকা থেকে রিজার্ভ সিএনজি ভাড়া করে যেতে হবে হাদারপাড় ঘাটে। মানুষ বেশি হলে লেগুনা কিংবা মাইক্রোও নিতে পারেন। লোকাল কোনো সার্ভিস আছে বলে জানা নেই। রিজার্ভ সিএনজি ভাড়া ১,৫০০-১,৮০০ টাকা। রিজার্ভ লেগুনা ভাড়া ২,০০০-২,৫০০ টাকা।

নদীর দুইপাশে সতেজ প্রকৃতি; সোর্সঃ শত্রুঘ্ন অর্পিত

হাদারপাড় ঘাট-বিছানাকান্দি

হাদারপাড় ঘাটে গিয়ে নৌকা ভাড়া করতে হবে যা আপনাকে সরাসরি বিছানাকান্দি জিরো পয়েন্টে নিয়ে যাবে। ভরা বর্ষায় গেলে ভারত থেকে আগত পাহাড়ি ঢলে পানির পরিমাণ থাকে অনেক। তখন আপনি বিছানাকান্দির পাশাপাশি পান্থুমাই ও লক্ষ্মণছড়া ট্যুরিস্ট স্পটেও যেতে পারবেন। এক্ষেত্রে নৌকার ভাড়া কিছুটা বেশি। ১,৮০০-২,০০০ টাকা।

তবে বছরের অন্যান্য সময় নদীতে পানি কম থাকায় শুধু বিছানাকান্দিতে যাওয়া যায়। তখন ১,২০০-১,৫০০ টাকার মধ্যেই নৌকা রিজার্ভ পাওয়া যায়। প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টার পানিপথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছে যাবেন বিছানাকান্দিতে। পথে প্রকৃতি আপনাকে নদীর আশেপাশের মানুষের গ্রাম্য জীবনযাত্রা ও সবুজের মনোরম পরিবেশ উপহার দেবে।

পাথরের বিছানা; সোর্সঃ www.dainik-destiny.com

বিছানাকান্দি নামে পরিচিত এই জায়গাটিতে মূলত ভারতের খাসিয়া পর্বতের কয়েকটি স্তর এসে একই বিন্দুতে মিলিত হয়েছে। বিছানাকান্দিতে পৌঁছেই দেখতে পাবেন খাসিয়া পর্বত হতে সৃষ্ট ঝর্ণা থেকে নেমে আসা পানির অবিরাম ধারা। ঝর্ণাটার ঠিক উপরেই রয়েছে ব্রীজ। যদিও ঝর্ণাসহ ব্রীজটি ভারত সীমান্তে অবস্থিত হওয়ায় সেখানে যাওয়া যায় না।

দুপুরের মধ্যে আবার ঘাটে চলে আসুন। ঘাটে আসার আধা ঘণ্টা আগে সিনএনজি চালককে ফোন দিয়ে জানিয়ে দিন। সিএনজি করে সিলেট আসার পথেই রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট পড়বে। সেখানে নেমে আবার নৌকা ভাড়া করতে হবে। এখানে নৌকা ভাড়া মোটামুটি ফিক্সড ১,২০০ টাকা।

পাহাড়ি ঢলে নেমে আসা পাথরের বিছানায় শুয়ে প্রকৃতির এই আশ্চর্য দৃশ্য দেখে চোখে নেশা লেগে যাবে। সবুজ পাহাড়, পাহাড়ের গা ঘেঁষে লেগে থাকা ঘন মেঘপুঞ্জ। অসাধারণ এই দৃশ্যের বর্ণনা লিখে প্রকাশ করা এক প্রকার অসম্ভব।

রাতারগুলের সন্ধ্যা; সোর্সঃ শত্রুঘ্ন অর্পিত

বিছানাকান্দি-হাদারপাড় ঘাট-রাতারগুল

গাছ-গাছালির মাঝে জলাভূমি বলে এখানে বড় নৌকা চলাচল করতে পারে না। নৌকাগুলো অনেকটা ছোট ডিঙি টাইপের। পৃথিবীতে হাতে গোণা কয়েকটি মিঠা পানির জলাভূমির মধ্যে রাতারগুল একটি। বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে এ বন অনেকটা আমাজন বনের মতো।

পোকামাকড় কিংবা সাপে ভীতি থাকলে এখানে না যাওয়াই ভালো। কারণ মাঝে মাঝেই গাছের ডালে সাপ ঝুলে থাকতে দেখা যায়। তবে ভয়কে জয় করে একবার যেতে পারলে আমি নিশ্চিত জীবনের অন্যতম একটি স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে এটি। ভয়ানক এই রোমাঞ্চকর ভ্রমণ শেষে সন্ধ্যা হবার আগেই আবার ঘাটে চলে আসুন। সেখান থেকে সিএনজি দিয়ে সোজা সিলেট শহর।

বিছানাকান্দি থেকে ফেরার পথে; সোর্সঃ শত্রুঘ্ন অর্পিত

কোথায় থাকবেন

সিলেটের মাজারগেট সংলগ্ন রোডের দুইপাশে অসংখ্য ভালো ও মাঝারি মানের হোটেল রয়েছে। সেখানে অনায়াসেই থাকতে পারেন। এছাড়াও আছে হোটেল স্টার প্যাসিফিকের মতো লাক্সারী হোটেল।

কোথায় খাবেন

বিছানাকান্দি কিংবা রাতারগুল ট্যুরিস্ট স্পটের সামনে তেমন ভালো কোনো খাবার হোটেল দেখা যায় না। তবে শহরের জিন্দাবাজার এলাকায় অবস্থিত পাঁচভাই ও পানসী রেস্টুরেন্ট দুটি এখানে খুবই বিখ্যাত। সিলেটে এসে এই দুই রেস্টুরেন্টে না খেলে ট্যুর যেন অসম্পূর্ণ হয়ে থাকে।

নদীর পাড় ঘেঁষে গড়ে উঠেছে পাথর শিল্প; সোর্সঃ শত্রুঘ্ন অর্পিত

কিছু সতর্কতা

  • বিছানাকান্দিতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে পাথর তোলার কারণে এখানে বেশ কিছু জায়গায় বিশাল খাদের সৃষ্টি হয়েছে। পানির প্রচণ্ড স্রোতের কারণে সেসব জায়গায় ঘূর্ণির সৃষ্টি হয়। লাল কাপড় দিয়ে সংকেত দেয়া সেসব জায়গায় সাঁতার কাটা থেকে বিরত থাকুন।
  • রাতারগুলে সেফটির জন্য লাইফ জ্যাকেট ভাড়া নিতে পারেন। এখানে ৪০ টাকা দিয়ে লাইফ জ্যাকেট ভাড়া দেয়া হয়।
  • স্থানীয়দের সমস্যা হয় কিংবা বিরক্তবোধ করে এমন যেকোনো কাজ থেকে বিরত থাকুন।
  • সুন্দর এই পরিবেশে যেকোনো ধরনের ময়লা আবর্জনা ফেলা থেকে নিজেকে বিরত রাখুন। শ্রদ্ধা করুন প্রকৃতিকে। হ্যাপী ট্রাভেলিং।

Feature Image: শত্রুঘ্ন অর্পিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *