in

বাজেট ট্রিপে নেপাল: পোখারা দর্শন

প্রতিবেশি দেশ নেপালের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো পোখারা শহর। এই শহরকে পোখরাও বলা হয়। বিখ্যাত ফেওয়া লেকের তীরে গড়ে ওঠা সুন্দর, ছিমছাম পরিষ্কার ও আধুনিক শহর পোখারা। বাংলাদেশ থেকে ৬ জনের একটি গ্রুপ গিয়েছিলাম নেপাল এই গত মে মাসের ২২ তারিখ। কাঠমান্ডু একদিন থেকে পরের দিনের পরিকল্পনা ছিল পোখারা যাবার। কাঠমান্ডুর থামেলে হোটেল হিমালয়ান দর্শনে ছিলাম আমরা।

হোটেল থেকেই পোখারা যাবার বাসের টিকেট করি। সাধারণত কাঠমান্ডু থেকে পোখারা যাওয়ার নন এসি বাস ভাড়া ৬০০ নেপালি রুপি। আমরা এসি বাস ৮০০ নেপালি রুপিতে পেয়ে গেলাম। ব্যস আর দেরী না করে কেটে ফেললাম পরের দিনের বাসের টিকেট।


পরদিন সকাল ৭টায় বাস ছিল আমাদের। হোটেল থেকে চেক-আউট করে উঠে পড়লাম বাসে। নাস্তার জন্য কিনে নিলাম ২০ রুপি দামের ডোনাট। পুরো নেপালে বাসের ক্ষেত্রে একটা সাধারণ জিনিস চোখে পড়বে, সেটা হলো ৬ ঘণ্টার যাত্রাপথে এরা বাস থামায় ৩-৪ বার। তাই খাবার না নিয়ে উঠলেও কোনো ঝামেলা নেই, পথেই সেরে ফেলা যাবে সকালের কিংবা দুপুরের খাওয়া। কাঠমান্ডু থেকে পোখারার রাস্তা তুলনামূলকভাবে ভালো, সময় লাগে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা। দুপুর আড়াইটায় আমরা পোখরা ট্যুরিস্ট বাস পার্কে পৌঁছে যাই।

কাঠমান্ডুতে যেমন সবাই থামেলে থাকতে পছন্দ করে তেমনি পোখরাতে মানুষ ফেওয়া লেকের আশেপাশে থাকতে পছন্দ করে। ট্যুরিস্ট বাস পার্ক থেকে আমরা তাই ট্যাক্সি নিয়ে চলে গেলাম লেকসাইড এরিয়াতে। প্রতি ট্যাক্সিতে তিনজন বসা যায়, ভাড়া ২০০ রুপি। পোখরা এয়ারপোর্ট রোড হয়ে ১০ মিনিটের মাথায় লেকসাইড পৌঁছে গেলাম।

প্রচুর হোটেল এখানটায়। একটির চেয়ে আরেকটি সুন্দর। তবে যেহেতু বাজেট ট্রিপ তাই সৌন্দর্য হোটেলে না খুঁজে বাইরের প্রকৃতিতে খুঁজবো বলে একটু সস্তা হোটেল খুঁজছিলাম। বেশি দূর যেতে হলো না, ডান পাশের একটা গলি দিয়ে ঢুকেই হাতের ডান পাশে পেয়ে গেলাম হোটেল পিস গঙ্গা।

তিন জনের রুম প্রতি ভাড়া ৯০০ রুপি। রুমও বেশ সাজানো-গোছানো আর বাইরে একটা সুন্দর বাগান আছে। পোখারায় খাবারের দাম নাগালের মধ্যে নেই। নন-ভেজ থালি খেতে হলে গুনতে হবে ৩৫০ রুপির মতো। দুপুরটা আমরা চাউমিন খেয়েই কাটিয়েছি, রাতে একটা নন-ভেজ থালি দিয়ে উদরপূর্তি করে নিয়েছি। বিকেলে সাইকেল ভাড়া করে ঘুরে নিয়েছি আশপাশটা। প্রতি ঘণ্টায় ভালো সাইকেলগুলোর ভাড়া ১০০ থেকে ১৫০ রুপি।

তবে খুঁজলে আরো কম দামেও পাওয়া যাবে।
রাতে পরদিন পোখরা লোকাল জায়গাগুলো ঘোরার জন্য জীপ ভাড়া করতে বেরিয়েছিলাম। বুঝলাম বেশ দেরী হয়ে গিয়েছে। রাত ৮টার পর দোকান সব বন্ধ হতে শুরু করে। পরে হোটেল থেকে একটা মাইক্রোর ব্যবস্থা করে দিয়েছে ৭,৫০০ রুপিতে। ঘুরিয়ে দেখাবে সারাংকোট, বিন্দুবাসিনী মন্দির, বেগানাস লেক, শান্তি স্তুপা, মাহেন্দ্র কেভ, ব্যাট কেভ, দেবী’স ফল, শ্বেতী নদী। হোটেলের বাইরে এই কয়েকটা জায়গা ঘুরতে ৯,০০০ থেকে ১২,০০০ রুপি চাচ্ছিল তাই আর না ভেবে সকাল বেলা মাইক্রো রেডি রাখতে বলি আমরা।

সকাল সাড়ে চারটায় ঘুম থেকে উঠে সোয়া পাঁচটার দিকে বের হয়ে গেলাম সারাংকোটের উদ্দেশ্যে, লক্ষ্য সারাংকোটে সূর্যোদয় দেখা। হোটেল থেকে সারাংকোট যেতে সময় লাগলো মাত্র ২০ মিনিট। সরু আঁকাবাঁকা পথ ধরে গাড়ি উঠে যাচ্ছিল আমাদের, বুঝতে পারছিলাম অনেক উঁচুতে উঠতে হবে। গাড়ির জানালার কাঁচ ঘেঁষে অনেক নিচের পোখারা দেখা যাচ্ছিল।

সারাংকোট পৌঁছে গেলাম, কিন্তু অবস্থা হতাশাজনক। প্রচুর কুয়াশায় সূর্যোদয়ের কিছুই দেখা হলো না। তবে উপর থেকে পুরো পোখারাকে সুন্দর ক্যানভাসে আঁকা কোনো জলছবির মতো দেখাচ্ছিল। আধঘণ্টা সূর্যের অপেক্ষা করে চলে এলাম সারাংকোট থেকে।

তার পরের গন্তব্য ছিল বিন্দুবাসিনী মন্দির। সারাংকোট থেকে শ্বেতী নদী যাবার পথেই মন্দিরটি পড়ে। একটু উপরে অবস্থিত এই মন্দির বানানো নেপালের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের আদলে। পুরো মন্দির এলাকাটিই অনেক সুন্দর করে সাজানো। মন্দিরের উচ্চতার কারণে চারপাশের ল্যান্ডস্কেপ অনেক সুন্দর দেখা যায়, পাহাড়ের উপর গড়ে তোলা হরেক রঙের ঘরবাড়ি চোখে আনে প্রশান্তির আবেশ। অসাম্প্রদায়িক চিন্তাচেতনা থেকে লাল ইটে গড়া এই মন্দিরে সকাল সকাল বসে থাকলেও মন শান্ত হয়ে যাবে অপার্থিবতায়।


বিন্দুবাসিনী মন্দিরের নিচে একটা ছোটমতোন দোকানে ব্রেড আর অমলেট দিয়ে নাস্তা সারলাম, খরচ হলো ৫০ রুপি। গাড়ি এবার ছুটে চললো শ্বেতী নদীর দিকে। আমরা যদি আগে জানতাম আমাদের আসলে প্রাকৃতিক শ্বেতী নদীতে নিয়ে যাবে না, যাবে মানুষের তৈরী একটি পার্কে যার ভেতর একিটা টানেলের মধ্যে দিয়ে এই নদীর পানি প্রবাহিত হয় তবে কখনোই এখানে যেতাম না। যাওয়ার পর ৫০ রুপি দিয়ে পার্কের টিকেট কেটে যখন ভেতরে ঢুকলাম তখন বুঝলাম ৫০ রুপি নদীর জলে ভেসে গেল।

সেই টানেলের উপর থেকে নিচে তাকালে দেখা যায় পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে সরুপথে শ্বেতী নদী বয়ে চলেছে। এই নদীর নামকরণের প্রধান কারণ এর পানির রঙ, পুরোটাই প্রায় সাদা। পোখরার অনেক জায়গায়ই এই নদীর অস্তিত্ব পাওয়া যাবে।

শ্বেতী নদীর কৃত্রিম পার্ক থেকে বের হয়ে রওনা দিলাম ব্যাট কেভ আর মাহেন্দ্র কেভের দিকে। বেশিক্ষণ লাগলো না, ১০-১৫ মিনিটের মাথায় পৌঁছে গেলাম ব্যাট কেভে। সার্কভুক্ত ফরেনারদের জন্য টিকেট মূল্য ৮০ রুপি। এই টাকাটাও জলে যাবে কিনা এটা ভাবতে ভাবতে কিনেই ফেললাম সবাই মিলে। প্রতি ৩ জনের গ্রুপের জন্য একটা করে লাইট দিয়ে দেয় তারা। নামেই বুঝতে পারছেন গুহায় ঢুকছি, বাদুড়ের গুহায়। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে ঢুকে গেলাম গুহাখানায়।

যা ভেবেছিলাম তা নয়, বেশ বড়সড় গুহা। সাথে বাদুড়ের কিচিরমিচির তো আছেই। ঘুটঘুটে অন্ধকারের এই গুহার বের হওয়ার রাস্তাটি খুব চিকন আর বিপদজনক, তাই যে পথ দিয়ে এসেছিলাম সেই পথেই ফেরার পথ ধরলাম। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম মাহেন্দ্র কেভ কি এটার ব্যতিক্রম কিছু হবে? উত্তরে না বোধক ইঙ্গিত করায় আমরা গাড়িতে উঠে গেলাম। উদ্দেশ্যে বেগানাস লেক।

বেগানাস লেক শহর থেকে একটু বাইরে অবস্থিত। শহর থেকে প্রায় আধ ঘণ্টার মতো লাগলো বেগানাস লেক যেতে। লেকের কাছাকাছি আসতেই মনটা ভালো হয়ে গেল। এতক্ষণ মানুষে গড়া স্থান দেখে চোখ মরিয়া হয়ে উঠেছিল প্রাকৃতিক কিছু দেখার। পোখরা হ্রদের জন্য কেন বিখ্যাত তা এখানে এসে বুঝলাম। বিশাল বিশাল সব হ্রদের রাজ্য পোখরা।

বেগানাস লেকের ধার ঘেঁষে রয়েছে সুউচ্চ পাহাড় আর লেকের পানিতে অসংখ্য হলুদ নৌকা। মাঝি সহ বা ছাড়া দুই উপায়েই করা যায় নৌকা ভ্রমণ। একটি নৌকার ভাড়া ২০০ থেকে ৫০০ রুপির মধ্যে। বেগানাস লেকে বসে ছিলাম অনেকক্ষণ, হিমেল হাওয়া বয়ে যাচ্ছিল পুরো এলাকাটায়। যতদূর চোখ যায় শুধু পানি আর পানি।

বেগানাস লেক থেকে ফিরে গেলাম মূল শহরে। ড্রাইভার বললো পরের গন্তব্য শান্তি স্তুপা বা ওয়ার্ল্ড পিস প্যাগোডা। বেশিক্ষণ লাগলো না সেখানে পৌঁছাতে। কিন্তু গাড়ি যে জায়গায় পার্ক করে সেখান থেকে আরো অনেক উপরে এই প্যাগোডা। উপরে উঠে যেতে হয়ে সিঁড়ি দিয়ে। প্রায় ২০০-২৫০ সিঁড়ি উঠে যাওয়ার পর দেখা পেলাম শান্তি স্তুপার।

এখানে আসার সবচেয়ে ভালো সময় হলো বিকেলবেলায়। ফেওয়া লেক থেকে দেখা যায় এই সাদা প্যাগোডা। তেমনি এখান থেকে পুরো ফেওয়া লেক আর ফেওয়া লেকের আশেপাশের পুরো এলাকা দেখা যায়। প্যাগোডার শুভ্রতায় মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। তার উপর আশপাশের পাহাড় থেকে প্যারাগ্লাইডিং করে মানুষের ফেওয়া লেকে নামার দৃশ্য করেছে আরো মুগ্ধ। পোখরাতে আসলে অবশ্যই এখানে আসা উচিত।

আমাদের পোখরা ভ্রমণ প্রায় শেষের দিকে ছিল। শেষ গন্তব্য ছিল দেবী’স ফল আর গুপ্তেশ্বর মহাদেব কেভ। গুপ্তেশ্বরে ঢোকার রাস্তায় বেশ সুন্দর একটা বাজার আছে। হরেক রকমের নেপালি ছোটখাটো জিনিস নিয়ে পসরা সাজিয়ে বসেছে দোকানিরা। সবচেয়ে কমন কিছু জিনিস ছিল নেপালি পয়সা, গলার হার, হারের পেন্ডেন্ট আর পিতলের জিনিসপত্র।

গুপ্তেশ্বর মন্দিরটাও বেশ সুন্দর। তবে গুহার ভেতর যাওয়ার ইচ্ছে আর কারোরই করছিল না। এর মূল কারণ ছিল প্রচণ্ড রোদে সবার নাজেহাল অবস্থা। বাংলাদেশ থেকে শুনে গিয়েছিলাম দেবী’স ফলও আহামরি কোনো ঝর্ণা বা জলপ্রপাত নয়, তাই আর বেশি ঘোরাঘুরি না করে একটু বিশ্রাম নেয়াই ভালো মনে হলো।


তবে সেখানে পিতলের অনেক ভালো ভালো জিনিস পাওয়া যায়। দামও এক একটার আকাশচুম্বী, তবে দামাদামি করার সুযোগ আছে। তবে বাংলাদেশ ইমিগ্রেশন পিতলের জিনিস নিয়ে ঝামেলা করে বলে সেগুলো আর কেনা হয়নি। পোখারার লোকাল জায়গাগুলো ঘুরতে বেশি সময় লাগবে না, ভোরে বের হলে বিকেলের আগে শেষ হয়ে যাবে। আমাদের পরদিন সকালের বাস ছিল জমসম পর্যন্ত। সে গল্প নিয়ে আসছি পরের লেখায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *