in

বাজেট ট্রিপে নেপাল: কাঠমান্ডু পর্ব

প্রতিবেশী দেশ নেপাল সম্পর্কে ইতিমধ্যে অনেক লিখেছি, ইন্টারনেটের কল্যাণে আর সম্প্রতি নেপাল এয়ারপোর্ট ত্রিভুবনে ঘটে যাওয়া ইউএস বাংলা বিমান দুর্ঘটনার কারণে নেপাল সম্পর্কে অনেকে কম-বেশি জানেন। ঘুরতে যাওয়ার জন্য নেপাল সাধ্যের মধ্যে একটি অন্যতম দেশ। প্রতিবছর বেশ ভালো সংখ্যক মানুষ ঘুরতে যায় নেপাল। পাহাড়, বরফ আর এভারেস্টের জন্মভূমি আমাদেরও বোধ হয় ডাকছিল হাতছানি দিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের শেষের দিকে এগোচ্ছি, তাই ভাবছিলাম সবাই মিলে শেষ একটা ট্যুর দিয়ে আসি।

সবার আগে নেপালের নামটাই উঠে আসে। মাঝখানে ভারতের রাজস্থান, কেরালা যাবার অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে নেপালই ঠিক হয় শেষ সিদ্ধান্তে।

যেহেতু আমরা বাজেট ট্রাভেলার তাই প্রথমেই আকাশপথে নেপাল যাওয়া যাবে না, তার উপর বিমান দুর্ঘটনায় নেপাল ভালো নাম কামিয়েছে। তাই যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো সড়কপথে ভারত হয়ে। এজন্য ভারত থেকে নিতে হবে ট্রানজিট ভিসা। নেট ঘেটে দেখলাম ভারত শেষ ট্রানজিট ভিসা দিয়েছে গত বছর ডিসেম্বরে। পরিচিত অনেকে বললো ভারত এখন আর নেপালের জন্য ট্রানজিট দেয় না। ভড়কে গেলাম রীতিমত। কী করবো বুঝতে পারছিলাম না। ভিসাখানা না দিলে তো পুরো রমজান বাসায় বসে থাকতে হবে।

অতঃপর সাহস করে উপরওয়ালার নাম নিয়ে শুরু করলাম ট্রানজিট ভিসার কাজ। এই ট্রানজিট ভিসা করাতে আমাদের খুলনা থেকে ৩ বার ঢাকা দৌড়াতে হয়েছে। একবার মনে হয় পাবো আরেকবার মনে হয় হবে না ট্রানজিট পাওয়া। অবশেষে যাওয়ার একদিন আগে গুলশান-১ থেকে যখন পাসপোর্ট হাতে পেলাম ভেতরে ট্রানজিট ভিসা স্টিকার দেখে এত ভালো লেগেছিল যে সবাই সবাইকে জড়িয়ে ধরে আইভ্যাকেই নেচেছিলাম। নেপালের জন্য ট্রানজিট কীভাবে পাওয়া যাবে তার উপায় নিচে দিয়ে দিয়েছি।

ট্রানজিট তো হলো, এবার যাত্রা শুরু করার পালা। ঝামেলা ছিল ট্রানজিট পাবো কিনা এই দ্বিধা-দ্বন্দে কিছুই গুছিয়ে রাখতে পারিনি। এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যে ব্যাগ গুছিয়ে বের হয়ে পড়ি বাসা থেকে, গন্তব্য বুড়িমারি। নেপাল সড়কপথে যাওয়ার রুট হলো ঢাকা থেকে প্রথমে বুড়িমারি যেতে হবে, হানিফ পরিবহনে বাস ভাড়া ৬৫০ টাকা। বুড়িমারি বর্ডারে ইমিগ্রেশন শেষ করে ওপাশের বাইপাস থেকে উঠে পড়তে হবে শিলিগুড়ির বাসে।

শিলিগুড়ি পৌঁছাতে সময় লাগবে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা, ভাড়া নেবে ৬০ রুপি। শিলিগুড়ি পৌঁছেই দেরী না করে উঠে পড়তে হলো নেপাল পানির টাংকির বাসে। সময় লাগবে ৪০ মিনিট, ভাড়া ৩০ রুপি। পানির টাংকি নেমে একটু হেঁটে কাউকে জিজ্ঞেস করে চলে যেতে হবে রানীগঞ্জ ইমিগ্রেশনে। এখান থেকে ভারতের এক্সিট সীল নিতে হবে পাসপোর্টে, কারণ আপনি ভারত ছেড়ে নেপালে ঢুকছেন। এক্সিট সীল পাসপোর্টে পড়লে অটোতে উঠে চলে যেতে হবে কাকরভিটার নেপাল ইমিগ্রেশনে। তারা আপনার নেপালের এন্ট্রি সীল দেবে।

নেপালের কাকরভিটা দিয়ে ভারত থেকে নেপালে প্রবেশ করতে হয়। কাকরভিটা আর পানির টাংকির মধ্যে বড় একটি ব্রীজ আছে যা দুই দেশকে আলাদা করেছে। কাকরভিটা থেকে কাঠমান্ডুর শেষ বাসে ছেড়ে যায় বিকেল সাড়ে পাঁচটায়। কাঠমান্ডু পর্যন্ত এসি বাসে ভাড়া ১,৬০০ নেপালি রুপি/ ১,০০০ ইন্ডিয়ান রুপি, ননএসি ভাড়া নেপালি ১,০০০ রুপি।

ভারতীয় আর নেপালি দুই রুপীই পুরো নেপালে চলে। হিসেবের সুবিধার জন্য সকল খরচ আমি নেপালি রুপিতেই দেবো এখানে। আমাদের বাস ধরতে ধরতে বিকেল সাড়ে পাচঁটা বেজে গিয়েছিল তাই শেষ এসি বাসটার শেষ সিটগুলো পেয়েছিলাম। খুব কষ্টে সে রাতটা পার করে দিলাম, তবুও এসি থাকায় কষ্ট একটু হলেও লাঘব হয়েছে। পরদিন সকাল ১০টায় কাঠমান্ডু পৌঁছালাম।

ছোটবেলা থেকে কাঠমান্ডুর একটা ছবি মনে আঁকা ছিল আমার, একটু ধোঁয়াশা পরিবেশে দূরের পাহাড় দেখা যাবে আর হালকা হালকা শীতে সন্ধ্যা নামবে। কাঠমান্ডু নেমে দেখলাম যা চিন্তা করে এসেছি তার কোনোটাই মিলছে না। চারদিকে ধুলা-রাশি আর প্রচণ্ড গরম। এমনিতে ১৪ ঘণ্টা জার্নি করে মেজাজ খিটখিটে অবস্থা তার উপর আবার কাঠফাটা গরম। থামেলে হোটেল বুক দেয়া ছিল আমাদের। কাঠমান্ডু যেখানটায় নেমেছি ওটাকে বলা হয় নিউ বাস পার্ক।

সেখান থেকে আবার থামেলে সরাসরি বাস যায় না। থামেলে যেতে হলে প্রথমে যেতে হবে বালাজু নামক এক জায়গায়। সেখান থেকে যে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই দেখিয়ে দেবে থামেলের রাস্তা। মোটামুটি নেপালের ভালো সব হোটেল থামেলেই আছে। নেপালের লোকাল বাস ভাড়া ১৫ থেকে ২৫ রুপির মধ্যে সীমাবদ্ধ।

হোটেলে পৌঁছে গেলাম সকাল ১১টার দিকে। রুম বেশ সুন্দর, সাজানো-গোছানো। তার চেয়েও বড় কথা ৩ জন করে প্রতি রুমে এই রকম দুটি রুম এক রাতের জন্য আমরা পেয়েছি মাত্র ২০ ডলারে বুকিং ডট কম থেকে। হোটেলের নাম “হিমালয়ান দর্শন”। থামেলের কাশ্মীর মার্গে দ্য হিমালয়ান ব্যাংকের সামনে যে নর্থ ফেইসের অফিশিয়াল সুপারশপ আছে সেই গলি ধরে দুই মিনিট হেঁটে গেলেই পাওয়া যাবে হোটেলটি। হোটেলে উঠেই একে একে গোসল সেরে নিলাম, আবার কখন হবে কে জানে!

পেটের ক্ষিদে আর ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছে দুটোই মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। পায়ে জুতা আর গায়ে শার্ট চাপিয়ে বেরিয়ে পড়লাম থামেলের রাস্তায়। থামেল মোটামুটি সুন্দর জায়গা, রাস্তার ধারে হরেক রকমের পিতলের জিনিস নিয়ে দোকান বসানো।

ছোটখাট একটা দোকানে ঢুকে চিকেন ফ্রাইড রাইস অর্ডার দিলাম। নেপাল সম্পর্কে দুটো জিনিস শুনে এসেছিলাম, কাঠমান্ডু হেঁটে হেঁটেই ঘুরে ফেলা যাবে আর খাবারের দাম অত্যধিক বেশি এখানে আর স্বাদ জঘন্য। সে হিসেবে ৯০ রুপিতে ফ্রাইড রাইস পাওয়ায় যারপরনাই খুশি ছিলাম আমরা। ফ্রাইড রাইস খাওয়ার পর স্বাদের ব্যাপারটাও মাথা থেকে মুছে গেল, খাওয়া যায়, একদম জঘন্য না।

খাওয়া দাওয়া শেষে মূল রাস্তায় এসে এক ভদ্রলোককে হিন্দিতে জিজ্ঞেস করলাম পশুপতিনাথ মন্দির কোন দিকে। বিনয়ের সাথে উত্তর দিলেন আগে রত্না পার্ক যেতে হবে সেজন্য। রত্না পার্কের বাস থামেল থেকেই পাওয়া যায়, উঠে গেলাম, ভাড়া ১৫ রুপি। রত্না পার্ক থেকে পশুপতিনাথ মন্দিরে যেতে হলে আগে যেতে হবে গৌসালা, ভাড়া ২০ রুপি। গৌসালার ঠিক বিপরীত পাশে পশুপতিনাথ মন্দির।

অনেক বড় আর বেশ কয়েকটি মন্দিরের সমন্বয়ে এই মন্দির গঠিত। নেপালের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা দেখতে চাইলে এখানে আসা যায়। কাঠমান্ডুতে নগরকোট আর চারটি মন্দির যথা- পশুপতিনাথ, শম্ভুনাথ, বৌদ্ধনাথ, বৌদ্ধনীলকণ্ঠই বিখ্যাত। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল পোখারার সারাংকোট আর নগরকোট এবং সারাংকোটের যেকোনো একটি দেখলেই চলে তাই কাঠমান্ডুতে নগরকোট দেখার ইচ্ছে হয়নি। ম

ূল পশুপতিনাথ মন্দিরের ভেতর ছবি তোলা যায় না, তবুও ফাঁক-ফোঁকর দেখে তুলেছি বাসায় দেখাবো বলে। মূল মন্দিরের ভেতরটা খুব সুন্দর। প্রতিনিয়ত প্রচুর মানুষ এখানে পূজা দিয়ে যাচ্ছে। পশুপতিনাথ দর্শন শেষে আর মন্দির দেখতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। কারণ সবার শরীর তখন প্রচণ্ড ক্লান্ত।

পরদিন সকালে আমাদের পোখারার বাস ছিল, সেখান থেকে নেপালের আরো ভেতরে, অন্নপূর্ণা রেঞ্জ, নীলগিরি রেঞ্জের একদম কাছে জমসম গ্রাম পর্যন্ত গিয়েছি। সেই গল্প আসছে। ফেরার পথে আরো একদিন থামেলে থেকেছিলাম আমরা।

শেষ দিন থামেল থেকে হাঁটতে হাঁটতে চলে গিয়েছিলাম দরবার স্কয়ার। থামেল থেকে মাত্র ১৫-২০ মিনিটের হাঁটা পথে শান্তি খুঁজতে চাইলে চলে যাবেন দরবার স্কয়ারে। প্রচুর কবুতর আর মন্দিরের আদলে বানানো দরবার স্কয়ারে গেলেই ভালো লাগবে। দরবার স্কয়ার থেকে ফেরার পথে টুকটাক কেনাকাটাও করে ফেলতে পারবেন, ঐতিহ্যবাহী কিন্তু তুলনামূলক সস্তা জিনিস এখানেই পাওয়া যায়। কাঠমান্ডু ছিলাম মোট ২ দিন, পায়ে হেঁটেই শেষ করেছি কাঠমান্ডু ভ্রমণ।

ফিচার ইমেজ– লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *