in

পর্বত দিবসে সোনার পাহাড়ের গল্প!

যেকোনো ভ্রমণে আমার একটা বিশেষ সৌভাগ্য হলো, যত রাতেই ঘুমাই না কেন, খুব খুব ভোরে আমার ঘুম ভেঙে যায়। যে কারণে ভ্রমণের প্রতিটি দিনই আমার কাছে অনেক প্রাপ্তি হয়ে ধরা দেয় লম্বা সময় হাতে পাওয়ায়। কারণ আমি মনে করি ঘুমোতে তো আসিনি, এসেছি-ই তো দেখতে। তাই যতটা পারি দু’চোখ ভরে দেখে নেয়া যাক। কাছে, দূরে, আশে-পাশে, আকাশে, বাতাসে, গাছে-গাছে, লতায়-পাতায়, নদীতে, মাঠে, ঘাটে। তাই আমার প্রাপ্তির খাতাটাও ভরে ওঠে কানায় কানায়। এবং শেষ পর্যন্ত কোনো ভ্রমণ নিয়েই আমার তেমন কোনো আক্ষেপ বা অপূর্ণতা থাকে না। তো সেদিনও তেমনই হয়েছি।    

আগের রাতে রূপালী নদীর রূপের স্রোত দেখে এসে সুখের নিদ্রা নিয়েছিলাম আমাদের সবুজ তাবুর ভেতরের মোটা মোটা দুই লেপের মাঝে। উহ, কি যে শীত ছিল বলে বোঝানো মুশকিল। শুধু বিছানাটা একটু গরম হতেই এক ঘণ্টার বেশী লেগেছিল। তাও বিছানার এক পাশ একটু গরম হয় তো অন্যপাশ হিম হিম ঠাণ্ডা। যেন বরফের জল ছিটিয়ে রেখেছিল কেউ! অনেকটা সময় ঘুমে জাগরণে থাকার পরে একটা সময় ঘুমে তলিয়ে গেলাম। কিন্তু মধ্যরাতে ভীষণ বিপদে পড়েছিলাম প্রাকৃতিক ডাকের চাপে। যে বিড়ম্বনার গল্পটা কখনোই বলা হবে না বোধহয়!

সোনা রঙ ছড়ানো। ছবিঃ লেখক 

আবারো ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিলাম। যখন ঘুম ভাঙে তখনো বাইরের আলো ফোটেনি তাবুর ভেতর থেকে মোটা ডাবল লেপের ভেতর থেকে মুখ বের করে টিপটিপ করে তাকিয়ে বুঝতে পেরেছিলাম। একটু ভাবলাম, আবার কি ডুব দেব উষ্ণ লেপের তলায়? নাকি বাইরে বের হব অপার্থিব কিছু দেখার আশায়? এতো বেশী ঠাণ্ডা ছিল যে কয়েক মুহূর্ত ভাবতেই হলো, নিজের সাথেই নিজেকে একটু বোঝাপড়া করতে হলো। শেষমেশ বাইরে একটু মানুষের আনাগোনা টের পেলাম বোধহয়। তাই একটু কষ্ট হলেও শেষ পর্যন্ত বুট পরে, জ্যাকেট গায়ে চাপিয়ে বের হলাম।

বাইরে বের হয়েই দেখি আর্জেন্টাইন ট্রেক টিম গোমুখ যাবার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। আমিও আর দেরি না করে ঝটপট রেডি হতে গেলাম। আগের রাতেই আমার দুই তাবু সঙ্গীর সাথে কথা পাকা হয়ে গেছে যে ওনারা আজকে আর গোমুখ গেলেও গাঙ্গোত্রী ফিরে যাবে না। অনেক কষ্ট হয়েছে দিনে। তাই আজকে গোমুখ থেকে ফিরে, রেস্ট করে কাল সকালে ফেরার পথ ধরবেন। যে কারণে আজ আমি আরও একা, কারো জন্যই অপেক্ষা করতে হবে না। নিজের মতো করে গোমুখ গিয়ে, নিজের মতো করে ফিরে আসা যাবে। চূড়ান্ত ট্রেকের প্রস্তুতি নিয়ে, ওনাদেরকে বিদায় জানিয়ে তাবুর বাইরে বেরিয়ে পড়লাম।

সোনার পাহাড়! ছবিঃ লেখক 

বাইরে বেরিয়ে যা দেখলাম তা কীভাবে আর কোন ভাষায় প্রকাশ করলে যে সঠিক হবে সে ভাষা আমার জানা নেই! শুধু হাঁ করে তাকিয়ে ছিলাম আকাশের দিকে, পাহাড়ের দিকে, সূর্য রশ্মির বিপরীত দিকে। এমন আকাশ, এমন পাহাড়, এমন রোদের মহিমা, এমন আলো আর এমন কিছু আমি আগে কোনোদিন দেখিনি। এমন সোনায় মোড়ানো সবকিছু এই জীবনে প্রথমবার দেখালাম। আগের রাতে আকাশে আকাশে, পাথরের পাহাড়ের মাথার উপরে যে রুপালী পাহাড়ের চূড়া দেখেছিলাম, আজ সেগুলো আগের রাতের চেয়েও দামী, দুর্লভ আর অমূল্য হয়ে ধরা দিয়েছে।

কারণ পুরো সাদা পাহাড়ের যতগুলো চূড়ার যেখানে যতটুকু দেখা যাচ্ছে তার সবগুলোই সোনা হয়ে গেছে! আগের রাতেই যারা রুপা ছিল, সকালে তারা সোনা হয়ে গেছে! কী অসম্ভব, কিন্তু একদম সত্যি! চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে সোনার পাহাড়, সোনালী চূড়া আর সোনায় মোড়ানো পর্বতমালা! আমি কয়েক পলক তাকিয়ে থেকে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে গিয়েছিলাম কী করবো আর কী করব না ভেবে। তাকিয়ে থাকবো, নাকি ছবি তুলবো, নাকি ভিডিও করবো? মোবাইল বের করবো না ক্যামেরা দিয়ে ক্লিক করবো?

এই সময়, হ্যাঁ শুধুমাত্র এই সময়টাতেই নিজেকে বড় অসহায় লাগছিল, একা একা ট্রেক করতে আসায় একটা আফসোস হচ্ছিল। কারণ এই সোনার পাহাড়ের সাথে কোনো ছবি তোলা হলো না আমার! একটা কী ভীষণ আক্ষেপ, একটা কষ্ট আর কিছুটা অসহায়ত্ব বুকে চেপে রেখেই ক্যামেরা বের করে সোনার পাহাড়ের ছবি তুলে রাখলাম কিছু।

এদিকে চারদিকের পাহাড়ে পাহাড়ে সূর্যের প্রথম আলো পড়ে পুরো পাহাড় যেন সোনায় মুড়ে যেতে শুরু করলো। আর শ্বেতশুভ্র পাহাড়ের চূড়াগুলো তার সোনারঙ বদলে নানা রঙের খেলায় মেতে উঠতে শুরু করলো। কোনো পাহাড়ের চূড়া হালকা গোলাপি হয়ে ধরা দিচ্ছে, তো কোনো পাহাড়ের চূড়া লাল রঙে রেঙে উঠছে ধীরে ধীরে। কোথাও পাহাড়ের সারি রঙধনু রঙ ঢেলে দিচ্ছে সূর্যের কাছে রঙ ধার করে। আর সেই সাথে চারদিকের যত পাহাড় সব যেন সোনায় সোনায় মুড়িয়ে নিচ্ছে নিজেকে। যতদূর চোখে যায় সব পাহাড়ে যেন সোনা ছড়িয়ে দিয়েছে সকালের সোনালী সূর্যের আভা।

সোনায় মোড়ানো চূড়া! ছবিঃ মাহমুদ হাসান রাজীব

আর দেরি না করে সোনায় মোড়ানো পাহাড় সারির মাঝ দিয়েই চলতে শুরু করেছিলাম গোমুখের পথে। চার কিলোমিটার পাহাড়ি ট্রেইলে ট্রেক করতে হবে। ভিন্ন মতে ৬ কিলোমিটার। আমার, আমাদের আজকের আর এই ট্রেকের শেষ আর আসল গন্তব্য, গোমুখ। সোনায় মোড়ানো পথে, সোনায় মোড়ানো পাহাড়ের মাঝ দিয়ে, এক সোনা ছড়ানো সকালে ট্রেক করে চলেছি আর এক সোনায় মোড়ানো পাহাড়ের পাদদেশে যাবো বলে। ভাগীরথী পিক, গ্রুপের কাছে। যে গ্রুপের বরফ গলা গ্লেসিয়ার থেকে গঙ্গা নদীর উৎপত্তি। সে গোমুখের সন্ধানে, দর্শনে।

সামনে আকাশের দিকে যতদূর চোখ যায়, সবই সোনায় মোড়ানো পাহাড় চূড়া, ভাগীরথী পিক, শিবলিঙ্গ সহ আসেপাশে আর পিছনেও সকালের সোনা রোদ গায়ে মেখে দাঁড়িয়ে আছে সোনার পাহাড়, সোনায় সোনায় মোড়ানো চূড়া নিয়ে। আকুল আর ব্যাকুল করে দিয়ে সবাইকে।

এই সোনার পাহাড়ের দেখা পেয়েছিলাম আমার গোমুখ ট্রেকের বেজ ক্যাম্প ভুজবাসাতে। ভুজবাসা হলো, ভারতের উত্তরখণ্ডের দেরাদুন থেকে উত্তর কাশী হয়ে গাঙ্গোত্রী বাসে বা জীপে করে গিয়ে, ১৪ কিলোমিটার ট্রেক করে এই ভুজবাসা পৌছাতে হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *