in

বিশ্বের দীর্ঘতম সব টানেলের দুর্দান্ত কাহিনীকল্প

টানেল শব্দটি কানে এলেই সবার আগে মাথায় আসে গাড়ি বা ট্রেনে করে মাথার উপর আর দুইপাশে কংক্রিটের দেয়ালে ঘেরা অন্ধকার পথ পাড়ি দেয়ার বিষয়টি। টানেল মানেই রোমাঞ্চ, অন্যরকম এক অভিজ্ঞতা৷ থ্রিলার বা হরর সিনেমাগুলোতে টানেল নিয়ে অনেক মিথের প্রচলন রয়েছে। ট্রেনে করে টানেল পাড়ি দিতে গিয়ে বুঝেছিলাম কতটুকু রোমাঞ্চ কাজ করে এটায়, গুণে গুণে ১০৩টা টানেল পাড়ি দিয়েছিলাম ভারতের কালকা স্টেশন থেকে শিমলা যাওয়ার পথে।

আবার শিমলা থেকে মানালি যাওয়ার পথে পড়েছিল বিশাল লম্বা এক সড়ক-টানেল। ড্রাইভার ডেকে তুলে দিয়েছিল আমাদের, অবাক হয়ে ভারতের অন্যতম দীর্ঘ টানেল দেখেছিলাম ঘুম ঘুম চোখে৷ টানেল নিয়ে রোমাঞ্চপ্রিয় মানুষের আগ্রহ প্রচুর৷ আজকে তাই গল্প করবো আমার অন্যতম পছন্দের বিষয় টানেল নিয়ে। এই লেখায় থাকছে বিশ্বের দীর্ঘতম সব টানেলের গল্প৷ চলুন তাহলে শুরু করা যাক।

১. গোথার্ড বেইজ টানেল, সুইজারল্যান্ড

ছবিঃ www.silicon.co.uk

পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘতম এবং গভীরতম পাতাল টানেল হিসেবে নাম লিখিয়েছে সুইজারল্যান্ডের গোথার্ড বেইজ টানেল। প্রায় ৫৭ কিলোমিটার লম্বা এই টানেল তৈরী করতে সময় লেগেছে ১৭ বছর আর খরচ হয়েছে প্রায় ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সর্ব সাধারণের রেল ভ্রমণের জন্য টানেলটি ২০১৬ সালের ১১ ডিসেম্বর খুলে দেয়া হয়। মজার ব্যাপার হলো আজকেও ১১ ডিসেম্বর, টানেলটি খুলে দেয়ার দুই বছর পূর্ণ হলো আজ।

ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,৩০০ মিটার (৭,৫৪৫ ফুট) নিচের এই পাতাল টানেলের তুলনা শুধুমাত্র এর নিজের সাথেই চলে। এই টানেলটি জুরিখ, সুইজারল্যান্ড এবং মিলান, ইটালি হয়ে চলে গেছে। উত্তরের শহর এরস্টফেল্ড থেকে দক্ষিণের শহর বডিও পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা এই টানেলের মধ্যে বুলেট ট্রেনের গতি সর্বোচ্চ প্রতি ঘণ্টায় ২৫০ কিলোমিটার। মানে ৫৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে ট্রেনগুলোর লাগে মাত্র ২০ মিনিট৷

২. চ্যানেল টানেল, ইংল্যান্ড-ইউরোপ

ছবিঃ ws.nmmba.gov.tw

জাপানের সেইকেন টানেলের পরপরই বিশ্বের তৃতীয় দীর্ঘতম রেল-টানেল হিসেবে রয়েছে চ্যানেল টানেল যা ইংল্যান্ডকে কন্টিনেন্টাল ইউরোপের সাথে যুক্ত করেছে রেলওয়ের মাধ্যমে। এটি বিশ্বের তৃতীয় দীর্ঘতম রেল-টানেল হলেও বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা টানেল যেটি কিনা সমুদ্রের নিচ দিয়ে গেছে৷ আধুনিক প্রযুক্তির বিশ্বে এই ব্যাপারটি নতুন নয় কারণ ফরাসী প্রকৌশলী এলবার্ট মেথিউ সেই ১৮০২ সালে ইংলিশ চ্যানেলের নিচ দিয়ে টানেল করার প্রস্তাবনা দিয়েছিলেন যেখানে মধ্যবর্তী কোনো দ্বীপমতো করার কথা ছিল৷

সেই প্রস্তাবনারই আধুনিক সংস্করণ আজকের চ্যানেল টানেল। টানেল বিশেষজ্ঞ এবং প্রকৌশলী ম্যাট সাইকিস বলেন, আমরা মেগা প্রজেক্ট বলতে যা বুঝি তাই এই টানেলটি৷ ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই টানেলটি ইউরোপের ভূগোল পরিবর্তন করে দিয়েছে অনেকাংশে আর কমিয়ে দিয়েছে ইংল্যান্ড-ইউরোপ বিমান যাত্রার পরিমাণ।

৩. লায়েরডাল টানেল, নরওয়ে

ছবিঃ staticflickr.com

বিশ্বের দীর্ঘতম সড়ক টানেল হিসেবে বিখ্যাত নরওয়ের এই লায়েরডাল টানেল। টানেলটি তৈরী করতে খরচ হয়েছে প্রায় ১৫৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আর টানেলটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২৪.৫ কিলোমিটার৷ টানেলটির প্রতি মিটারে তাহলে হিসেব করুন কত খরচ হয়েছে? হিসেবের অংকটা দাঁড়ায় মাত্র ৬,২৫০ মার্কিন ডলারে মানে প্রায় ৫ লক্ষ টাকার মতো। কী অবাক হলেন? মনে মনে ভাবছেন হয়তো সব টাকা টেবিলের নীচ দিয়ে পাচার হয়ে গেছে?

ব্যাপারটি মোটেই এমন নয়, এই টানেলের রাস্তাটি তৈরী করা হয়েছে অত্যাধুনিক সব প্রযুক্তি ব্যবহার করে যেখানে একজন যাত্রী এবং ড্রাইভারের সব রকম সুবিধা এবং গাড়ি চালানোরত অবস্থায় তাদের মানসিক ভারসাম্যের দিকে রাখা হয়েছে সর্বোচ্চ মনোযোগ৷ এই টানেলটি তৈরী করা হয়েছে এমনভাবে যাতে কোনো যাত্রী এর মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় ক্লাস্ট্রোফোবিয়া এবং ক্লান্তিতে না ভোগেন৷ টানেল দিয়ে যাওয়ার সময় প্রতি ছয় কিলোমিটার পর পর একটি গুহা পড়বে যা টানেলের সৌন্দর্য আর অনন্যতা বাড়িয়েছে বহুগুণে৷

৪. টোকিয়ো বে একুয়া-লাইন, টোকিয়ো

ছবিঃ i.ytimg.com

টোকিয়ো বে একুয়া-লাইন টানেলকে দেখে প্রথমেই যে ভুলটা সবাই করে তা হলো একে ব্রীজ মনে করে বসে কারণ সাগরের উপর তৈরীকৃত এর ৪.৪ কিলোমিটারের সড়কাংশ। কিন্তু ভালো করে লক্ষ করলেই দেখা যাবে যে এর প্রায় ৯.৬ কিলোমিটার অংশ সমুদ্রের নিচে অবস্থিত৷ জাপানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুটি শহর কাওয়াসাকি আর কিসারাজুকে যুক্ত করেছে একুয়া-লাইন নামক এই টানেলটি৷ আগে যেখানে কাওয়াসাকি থেকে কিসারাজু যেতে সময় লাগতো পাক্কা নব্বই মিনিটি সেখানে এখন যেতে সময় লাগে মাত্র ১৫ মিনিট।

টানেল বিশেষজ্ঞ সাইকিস বলেন, “টানেলটি তৈরী করতে প্র‍য়োজন হয়েছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আন্ডারসি বোরিং মেশিন”। ২০১১ সালে ঘটে যাওয়া তহকো-প্যাসিফিক ভূমিকম্পে বেশ কিছু সময়ের জন্য আটকে গিয়েছিল এই টানেলের কাজ৷ ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই টানেলটি অবস্থিত যে মানব-তৈরী দ্বীপের উপর তার নাম উমি-হোতারো যেটি নিজেই একটি ঘুরতে যাওয়ার জায়গা যেখান থেকে টোকিয়ো বে’র নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখা যায় সবচেয়ে ভালোভাবে।

৫. আইসেনহাওয়ার টানেল, কলোরাডো

ছবিঃ www.codot.gov

বিশ্বের উচ্চতম টানেলগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে বিখ্যাত কলোরাডোর এই আইসেনহাওয়ার টানেল অবস্থিত সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে গুনে গুনে ১১,১৫৮ ফুট উপরে৷ আমেরিকান আন্ত-প্রাদেশিক মহাসড়ক ব্যবস্থার সর্বোচ্চ উচ্চতর সড়ক এটি৷ তবে এই টানেলের দৈর্ঘ্য বা উচ্চতার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ এর পেছনের কাহিনী। ১৯৭২ সালের দিকে যখন টানেলের নিমার্ণকাজ শুরু হয় তখন জ্যানেট বোনেমা নামের এক নারী শ্রমিক নিয়োগ দেয়া হয়েছিল সেখানকার খনিগুলোতে৷

তখনকার দিনে খনিতে মেয়েদের কাজ করাকে অশুভ লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হতো এবং দায়িত্বরত প্রকৌশলী চিন্তাই করেননি এখানে মেয়ে কাজ করতে আসবে৷ তিনি জ্যানেটের নাম জেমস হিসেবে টুকে নিলেন। পরে নিজের ভুল বুঝতে পারলে পুনরায় জ্যানেটকে নিজের কর্মক্ষেত্রে কাজ করার পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। আমেরিকান ইতিহাসে নারীবাদী জাগরণের এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ছিল এবং এরই মাধ্যমে আমেরিকায় সম-অধিকার আইন পাস হয়েছিল।

ফিচার ইমেজ- ws.nmmba.gov.tw

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *